বছরের প্রথম দিনেই ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়ে আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা করলো অস্ট্রেলিয়া। বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি এই দেশটি এবার তাদের স্কোয়াডে স্পিন আক্রমণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। তবে দল ঘোষণা করা হলেও অস্ট্রেলিয়ার শিবিরে স্বস্তি নেই পুরোপুরি, কারণ দলের মূল কয়েকজন তারকা ক্রিকেটার চোটের সঙ্গে লড়াই করছেন।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) ঘোষিত এই দলটিকে ‘প্রাথমিক দল’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই দলে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। তবে বড় কোনো অঘটন বা চোট সমস্যা নতুন করে দেখা না দিলে এই স্কোয়াডই চূড়ান্ত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
স্পিন অ্যাটাকে বৈচিত্র্যের সমাহার
সাধারণত অস্ট্রেলিয়া বাউন্সি উইকেট এবং পেস বোলিংয়ের জন্য পরিচিত হলেও, এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তারা স্পিন বিভাগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। দলের প্রধান লেগ স্পিনার অ্যাডাম জ্যাম্পার সঙ্গে দলে নেওয়া হয়েছে বাঁহাতি স্পিনার ম্যাথু কুনেমানকে।
শুধু জ্যাম্পা বা কুনেমানই নন, স্পিন অলরাউন্ডার হিসেবে দলে জায়গা করে নিয়েছেন তরুণ প্রতিভা কুপার কনোলি। তাকে একজন পুরোদস্তুর স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। এর বাইরেও দলের অভিজ্ঞ গ্লেন ম্যাক্সওয়েল এবং ম্যাথু শর্ট অফ স্পিনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রস্তুত। লেগ স্পিন, বাঁহাতি অর্থোডক্স এবং অফ স্পিন সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্পিন আক্রমণে এবার কোনো ফাঁক রাখা হয়নি। উপমহাদেশের কন্ডিশন বা ধীরগতির উইকেটের কথা মাথায় রেখেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
চোটাক্রান্ত তারকাদের নিয়ে ফুরোয়নি অপেক্ষা
দল ঘোষণা করা হলেও অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড এবং নির্বাচকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। কারণ দলের গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তম্ভ প্যাট কামিন্স, জশ হেইজেলউড এবং টিম ডেভিড বর্তমানে চোটের কারণে মাঠের বাইরে রয়েছেন। কোচ আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, চোট থাকলেও এই তিনজনকে স্কোয়াডে রাখা হবে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করা হবে।
১. জশ হেইজেলউড
চোটাক্রান্তদের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছেন অভিজ্ঞ পেসার জশ হেইজেলউড। গত নভেম্বরে শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচ খেলার সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান তিনি। সেই চোট কাটিয়ে ওঠার লড়াইয়ের মাঝেই একিলিসে নতুন করে ব্যথা অনুভব করেন, যার ফলে অ্যাশেজ সিরিজ থেকে ছিটকে যেতে হয় তাকে। তবে ৩৫ ছুঁইছুঁই এই পেসার বিদায়ী বছরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অসাধারণ বোলিং করেছেন। কোচ আশা প্রকাশ করেছেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি বোলিংয়ে ফিরবেন।
২. প্যাট কামিন্স
অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক এবং পেস আক্রমণের নেতা প্যাট কামিন্স ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর দেশের হয়ে আর কোনো টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেননি। গত জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে চোট পাওয়ার পর থেকে তিনি খুব কমই মাঠে নেমেছেন। গত মাসে অ্যাডিলেইড টেস্টে স্বল্প প্রস্তুতি নিয়ে নেমে ৬ উইকেট শিকার করে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিলেও, তাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। চলতি মাসের শেষের দিকে তার আরেকটি স্ক্যান করানো হবে, এরপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
৩. টিম ডেভিড
সবচেয়ে বড় শঙ্কার নাম টিম ডেভিড। গত বছরটা ব্যাট হাতে স্বপ্নের মতো কাটিয়েছেন এই বিধ্বংসী ফিনিশার। বিশেষ করে ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পাওয়ার পর তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত শুক্রবার বিগ ব্যাশের ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়েন তিনি। স্ক্যানে তার পায়ে ‘গ্রেড টু টিয়ার’ ধরা পড়েছে। বিশ্বকাপের আগে ফিট হয়ে উঠতে তাকে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে।
সময়ের সুবিধা এবং বিশ্বকাপের সূচি
চোট সমস্যা থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার হাতে কিছুটা সময় রয়েছে। বিশ্বকাপ আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হলেও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১১ ফেব্রুয়ারি। টুর্নামেন্টের শুরুতে তাদের প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে, যা তুলনামূলক সহজ ম্যাচ। ১৬ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাদের প্রথম বড় পরীক্ষা দিতে হবে। তাই টিম ম্যানেজমেন্ট আশা করছে, এই সময়ের মধ্যে চোটাক্রান্ত খেলোয়াড়রা সেরে ওঠার সুযোগ পাবেন।
চমক ও বাদ পড়া ক্রিকেটারদের তালিকা
এবারের স্কোয়াডে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে তরুণ পেসার জেভিয়ার বার্টলেটের অন্তর্ভুক্তি এবং অভিজ্ঞ বেন ডোয়ার্শিসের বাদ পড়াকে।
- জেভিয়ার বার্টলেট ও বেন ডোয়ার্শিস: মিচেল স্টার্কের অবসরের পর বাঁহাতি পেসার হিসেবে বেন ডোয়ার্শিসের ওপর ভরসা রেখেছিল দল। বিদায়ী বছরে পেসারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচও খেলেছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপ দলে কোনো বাঁহাতি পেসার রাখা হয়নি। এর বদলে নতুন বলে জেভিয়ার বার্টলেটের দক্ষতার ওপরই আস্থা রেখেছেন নির্বাচকরা। তবে কামিন্স বা হেইজেলউড শেষ পর্যন্ত ফিট না হলে ডোয়ার্শিসের কপাল খুলতে পারে।
- কুপার কনোলি ও মিচেল ওন: গত জুলাইয়ে অভিষেকের পর নিয়মিত খেলা মিচেল ওন বাদ পড়েছেন মূলত কন্ডিশনের কারণে। তার জায়গায় ফিরেছেন কুপার কনোলি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র ৬টি টি-টোয়েন্টি খেলা কনোলিকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার ভাবা হয়। এবারের বিগ ব্যাশেও তিনি ব্যাট ও বল হাতে দারুণ শুরু করেছেন।
- উইকেটকিপার: দলে বিশেষজ্ঞ উইকেটকিপার হিসেবে কেবল জশ ইংলিসকে রাখা হয়েছে। ফলে অ্যালেক্স কেয়ারি ও জশ ফিলিপির বিশ্বকাপ স্বপ্ন আপাতত শেষ।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ও পাকিস্তান সিরিজ
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নামার আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে জানুয়ারির শেষ দিকে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। তবে সেই সিরিজের জন্য আলাদা দল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল ( Australia t20 world cup squad ):
মিচেল মার্শ (অধিনায়ক), জেভিয়ার বার্টলেট, কুপার কনোলি, প্যাট কামিন্স, টিম ডেভিড, ক্যামেরন গ্রিন, ন্যাথান এলিস, জশ হেইজেলউড, ট্রাভিস হেড, জশ ইংলিস, ম্যাথু কুনেমান, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, ম্যাথু শর্ট, মার্কাস স্টয়নিস, অ্যাডাম জ্যাম্পা।








