বিশ্বজুড়ে এখন একটিই নাম নিয়ে তোলপাড় চলছে জেফরি এপস্টেইন। মার্কিন ধনকুবের এই ব্যক্তির লালসার শিকার হয়েছে অসংখ্য কিশোরী ও তরুণী। কিন্তু এই জঘন্য কাজে তার প্রধান সহযোগী ছিলেন তার প্রেমিকা গিলেইন ম্যাক্সওয়েল। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নামে প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছে। এই নথিতে বেরিয়ে এসেছে কীভাবে তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শিশুদের ফাঁদে ফেলতেন এবং একটি বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
প্রথম শিকার: ইন্টারলোচেন স্কুলের সেই ভয়ংকর শুরু
তদন্তকারীদের মতে, এপস্টেইন এবং গিলেইনের এই পৈশাচিক মিশন শুরু হয় ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। মিশিগানের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারলোচেন স্কুল অব দ্য আর্টস’ এর একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে তারা প্রথম তাদের শিকার খুঁজে পান।
১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, যাকে নথিতে ‘জেন ডো’ বলা হয়েছে, সেখানে গানের প্রোগ্রামে অংশ নিতে এসেছিলেন। জেন ডো-র বাবা তখন মারা গেছেন এবং তার পরিবার প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে ছিল। ঠিক এই দুর্বলতাকেই পুঁজি করেন এপস্টেইন।
পার্কের বেঞ্চে পাতা ফাঁদ
একদিন ক্লাসের ফাঁকে জেন ডো যখন একা বসে ছিলেন, তখন গিলেইন ও এপস্টেইন তার সামনে এসে দাঁড়ান। এপস্টেইন নিজেকে একজন শিল্প অনুরাগী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জেন ডো-কে স্বপ্ন দেখান যে, তিনি প্রতিভাবান শিল্পীদের বৃত্তি দিয়ে থাকেন। অসহায় কিশোরীটি তখন জানত না যে, এটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের শুরু।
গডফাদারের আড়ালে এক পিশাচ: পরিবারকে বশ করার কৌশল
এপস্টেইন কেবল মেয়েদের নয়, তাদের পরিবারকেও কৌশলে বশ করতেন। জেন ডোর মা যখন এপস্টেইনের পাম বিচের বিশাল বাড়িতে দাওয়াত পেলেন, তখন এপস্টেইন তাকে এমনভাবে আশ্বস্ত করেন যে মা তাকে ‘গডফাদার’ বলে ডাকতে শুরু করেন।
১৪ বছর বয়স থেকেই জেন ডো নিয়মিত এপস্টেইনের বাড়িতে যেতে শুরু করেন। সেখানে তাকে দামি পোশাক কেনা, ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়ানো এবং বিলাসবহুল জীবন দেখানো হতো। মায়ের চিকিৎসার খরচ এবং মেয়ের গানের ক্লাসের টাকা দিয়ে এপস্টেইন তাদের সম্পূর্ণ কব্জা করে ফেলেছিলেন।
গ্রুমিং প্রক্রিয়া: গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের ভয়ংকর ভূমিকা
গিলেইন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন এই চক্রের মাস্টারমাইন্ড। তিনি মেয়েদের সাথে একজন বড় বোনের মতো মিশতেন। নথিতে দেখা যায়, সুইমিংপুলে গিলেইন প্রায়ই নগ্ন হয়ে শুয়ে থাকতেন এবং মেয়েদের বলতেন যে বড়দের জন্য এটি স্বাভাবিক। তিনি কিশোরীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমনভাবে তৈরি করতেন যাতে তারা এপস্টেইনের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হয়।
ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ভুয়া প্রলোভন
এপস্টেইন কিশোরীদের বলতেন তিনি বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট’ এর মালিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি মেয়েদের মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। আর এই সুযোগেই তিনি মেয়েদের অন্তর্বাস পরে ছবি তুলতে বাধ্য করতেন এবং ধীরে ধীরে যৌন নির্যাতনের স্তরে নিয়ে যেতেন।
মেয়ে দিয়ে মেয়ে ধরা: পিরামিড স্কিমের মতো যৌন পাচার
এপস্টেইন ফাইলসে সবচেয়ে চমকে দেওয়া তথ্য হলো, এপস্টেইন ও গিলেইন মেয়েদের দিয়ে মেয়ে সংগ্রহ করাতেন। তারা ভুক্তভোগীদের অফার করতেন যে, যদি তারা নতুন কোনো বন্ধু বা পরিচিত কাউকে নিয়ে আসতে পারে, তবে তাদের নগদ টাকা দেওয়া হবে।
২০০৭ সালের এক সাক্ষ্যে জানা যায়, নতুন কাউকে এনে দিলে প্রতিজনের জন্য ২০০ ডলার করে কমিশন দেওয়া হতো। তাদের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল ‘যত বেশি কাপড় খোলা যাবে, তত বেশি টাকা’। এই চক্রে ১৪ থেকে ১৮ বছরের মেয়েদেরই প্রাধান্য দেওয়া হতো।
ক্ষমতার আড়ালে বিচারহীনতা: কেন এতদিন কেউ মুখ খুলেনি?
এপস্টেইনের পরিচিতদের তালিকায় ছিলেন বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা, রাজপুত্র এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরা। এই ফাইলগুলোতে প্রায় ২০০ জনেরও বেশি নাম উঠে এসেছে যারা এপস্টেইনের দ্বীপে বা বাড়িতে যাতায়াত করতেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সখ্য থাকার কারণে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি।
মারিয়া ফার্মার নামের এক ভুক্তভোগী ১৯৯৬ সালেই অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু পুলিশ বা এফবিআই তখন কর্ণপাত করেনি। উল্টো তাকে ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জেন ডো প্রথম সাহস করে সব কথা প্রকাশ্যে আনেন।
এপস্টেইন ফাইলস: ৩৫ লাখ পৃষ্ঠার এক প্রলয়
বর্তমানে মার্কিন বিচার বিভাগ যে নথিগুলো প্রকাশ করেছে, তা কেবল কাগজের স্তূপ নয়, তা হাজার হাজার ভুক্তভোগীর কান্নার সাক্ষী। এতে রয়েছে:
- ২ হাজারটি গোপন ভিডিও।
- ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি।
- ভুক্তভোগীদের চোখের জলের সাক্ষ্য।
এপস্টেইন ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করলেও গিলেইন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে ২০ বছরের জেল খাটছেন। তবে এই ফাইলগুলো প্রকাশের ফলে বিশ্বের অনেক নামী-দামী মানুষের মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ট্রমার শেষ কোথায়?
এপস্টেইন ও গিলেইনের এই জঘন্য কর্মকাণ্ড কেবল অপরাধ নয়, এটি ছিল হাজারো কিশোরীর স্বপ্ন আর জীবন ধ্বংসের মহোৎসব। অনেকের আর্ট ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে গেছে, অনেকে সারা জীবনের মতো ট্রমায় আক্রান্ত। এই বিচার বিভাগীয় ফাইলগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সত্য একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই।








