বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, ভালো মানের স্বর্ণের ভরি আড়াই লাখ টাকা অতিক্রম করেছে। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবার জন্যই এখন দেশে স্বর্ণ কেনা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসী বা বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনা একটি বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। তবে ব্যাগেজ রুলস না জানলে বিমান বন্দরে পড়তে পারেন বড় বিপদে।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর ২০২৫-২৬ সালের নতুন বিধিমালা অনুযায়ী স্বর্ণ আনার বিস্তারিত নিয়ম আলোচনা করব।
ব্যাগেজ রুলস ২০২৫-২৬: নতুন বিধিমালায় যা আছে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি অপর্যটক যাত্রীদের জন্য ব্যাগেজ বিধিমালা সংশোধন করেছে। নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, স্বর্ণালংকার ও স্বর্ণের বার আনার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা এবং সুযোগ উভয়ই বাড়ানো হয়েছে। মূলত হুন্ডি প্রতিরোধ এবং বৈধ পথে স্বর্ণ আনা উৎসাহিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কতটুকু স্বর্ণালংকার শুল্কমুক্ত
নতুন ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী বিদেশ থেকে ফেরার সময় সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম (প্রায় ৮ ভরি ১০ আনা) ওজনের সোনার অলংকার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনতে পারবেন। তবে এখানে কিছু শর্ত রয়েছে:
- বছরে একবার: এই সুবিধা বছরে কেবল একবারই পাওয়া যাবে।
- অলংকারের ধরণ: একই ধরণের গহনা ১২টির বেশি আনা যাবে না।
- ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য: এই অলংকারগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আনা যাবে না।
রুপার অলংকার আনার নিয়ম
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার অলংকার আনার ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২০০ গ্রাম পর্যন্ত রুপার অলংকার শুল্কমুক্তভাবে আনতে পারবেন।
বিদেশ থেকে স্বর্ণের বার বা গোল্ড বার আনার নিয়ম ও শুল্ক
অনেকে গহনার বদলে গোল্ড বার বা বিস্কুট আনতে পছন্দ করেন। তবে গোল্ড বার কিন্তু শুল্কমুক্ত নয়।
- সর্বোচ্চ সীমা: একজন যাত্রী বছরে একবার সর্বোচ্চ ১০ তোলা (১১৬.৬৪ গ্রাম) ওজনের একটি সোনার বার আনতে পারবেন।
- শুল্কের হার: প্রতি তোলার জন্য আপনাকে ৫,০০০ টাকা শুল্ক বা ট্যাক্স প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ ১০ তোলা বার আনলে আপনাকে বিমান বন্দরে মোট ৫০,০০০ টাকা শুল্ক জমা দিতে হবে।
সতর্কতা: ১০ তোলার বেশি বা বছরে একবারের বেশি বার আনলে তা বাজেয়াপ্ত হতে পারে এবং আপনার বিরুদ্ধে চোরাচালানের মামলা হতে পারে।
বিমান বন্দরে ব্যাগেজ ঘোষণা ফরম ও কাস্টমস প্রক্রিয়া
আপনি যদি নির্ধারিত সীমার মধ্যে স্বর্ণ আনেন, তবে কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
ব্যাগেজ ঘোষণা ফরম (Baggage Declaration Form)
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হয়। এতে আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, ফ্লাইটের তথ্য এবং আপনার সাথে থাকা শুল্কযোগ্য পণ্যের বিবরণ দিতে হয়।
- কাদের জন্য প্রযোজ্য নয়: যাদের কাছে ১০০ গ্রামের কম স্বর্ণালংকার বা ২০০ গ্রামের কম রুপার অলংকার আছে, তাদের এই ফরম পূরণ না করলেও চলে।
- কাদের জন্য বাধ্যতামূলক: যাদের কাছে গোল্ড বার বা নির্ধারিত সীমার বেশি স্বর্ণালংকার আছে, তাদের অবশ্যই রেড চ্যানেল (Red Channel) ব্যবহার করতে হবে এবং ফরম পূরণ করতে হবে।
গ্রিন চ্যানেল ও রেড চ্যানেল কি
- গ্রিন চ্যানেল (Green Channel): আপনার কাছে কোনো শুল্কযোগ্য পণ্য না থাকলে আপনি সরাসরি এই পথ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন।
- রেড চ্যানেল (Red Channel): আপনার কাছে শুল্কযোগ্য স্বর্ণ (যেমন গোল্ড বার) বা অতিরিক্ত অলংকার থাকলে এই পথে গিয়ে কাস্টমস অফিসারকে জানাতে হবে।
অতিরিক্ত স্বর্ণ আনলে কি হবে? (শাস্তি ও জরিমানা)
অনেকে না বুঝে বা লুকিয়ে অতিরিক্ত স্বর্ণ আনার চেষ্টা করেন। কাস্টমস গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়লে এর ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ:
১. বাজেয়াপ্ত: অতিরিক্ত স্বর্ণ সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
২. জরিমানা: স্বর্ণের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বড় অংকের জরিমানা করা হয়।
৩. গ্রেপ্তার: যদি প্রমাণিত হয় যে আপনি চোরাচালানের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ এনেছেন, তবে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা ও জেল হতে পারে।
কেন বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনা এখন লাভজনক
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বর্তমানে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভরিতে ২,৫০,০০০ টাকার বেশি। বিপরীতে দুবাই, কাতার বা সিঙ্গাপুরে স্বর্ণের দাম অনেক কম।
- হিসাব: আপনি যদি বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম (৮.৫৭ ভরি) শুল্কমুক্ত স্বর্ণালংকার আনেন, তবে বর্তমান বাজার দরে আপনি প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা সাশ্রয় করতে পারবেন। এই বিশাল পার্থক্যের কারণেই প্রবাসীদের মধ্যে স্বর্ণ আনার প্রবণতা বাড়ছে।
স্বর্ণ কেনার সময় যা খেয়াল রাখবেন
বিদেশ থেকে স্বর্ণ কেনার সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই নিশ্চিত করুন:
- রসিদ বা ইনভয়েস: স্বর্ণ কেনার বৈধ রসিদ সাথে রাখুন। কাস্টমস কর্মকর্তারা চাইলে এটি দেখাতে হবে।
- হলমার্ক যাচাই: স্বর্ণের মান (১৮ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট বা ২২ ক্যারেট) নিশ্চিত করতে হলমার্ক দেখে কিনুন।
- ক্যারেট ও দামের পার্থক্য: মনে রাখবেন ক্যারেট অনুযায়ী দামের পার্থক্য হয়, তাই বুঝে বিনিয়োগ করুন।
স্বর্ণ কেবল একটি অলংকার নয়, এটি একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। তবে নিয়মের বাইরে গিয়ে স্বর্ণ আনা আপনার বিদেশ যাত্রা এবং ক্যারিয়ারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এনবিআরের নির্ধারিত ১০০ গ্রাম অলংকার এবং ১০ তোলা বার (শুল্ক সাপেক্ষে) এর নিয়ম মেনে নিরাপদ থাকুন। আপনার পরিবার ও প্রিয়জনের জন্য বিদেশ থেকে আনা এই উপহার যেন আপনার জন্য কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না করে, সেই দিকে নজর রাখুন।








