আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক সাম্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫টি অধ্যায় এবং ৫১টি দফায় সাজানো এই ইশতেহারে বিএনপি আগামী ৫ বছরের জন্য একটি আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশের নীল নকশা তুলে ধরেছে। চলুন জেনে নিই বিএনপির এবারের ইশতেহারে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে বিএনপি রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছে। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধে দলটি বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে:
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার: অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হবে।
- প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ: কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি অর্থাৎ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বাধীন করা হবে।
- পুলিশ সংস্কার: পুলিশ বাহিনীকে একটি সেবামূলক এবং আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
- জাতীয় ঐক্য: রাজনৈতিক বিভেদ দূর করতে একটি বিশেষ ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করা হবে।
বৈষম্যহীন অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা
সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিএনপি বেশ কিছু মানবিক কর্মসূচির কথা বলেছে:
- ফ্যামিলি কার্ড: প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু হবে, যার মাধ্যমে মাসে ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য দেওয়া হবে।
- কৃষক কার্ড: কৃষকদের ন্যায্যমূল্য ও সার-বীজ নিশ্চিত করতে বিশেষ কার্ড দেওয়া হবে।
- নারীর ক্ষমতায়ন: স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
- নতুন কর্মসংস্থান: তরুণদের জন্য আগামী ৫ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিএনপি একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু সুপরিকল্পিত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে:
- অর্থনৈতিক লক্ষ্য: ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
- ব্যাংকিং খাত সংস্কার: ব্যাংক খাতের লুটেরা ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও ব্যবসা সহজীকরণ করা হবে।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সিন্ডিকেট ভেঙে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে।
অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন
সারা দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য ইশতেহারে অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ পরিকল্পনা রাখা হয়েছে:
- বাণিজ্যিক রাজধানী: চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- হাওর ও উপকূলীয় উন্নয়ন: অবহেলিত হাওর, বাঁওড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হবে।
- স্মার্ট ঢাকা: ঢাকাকে একটি নিরাপদ, যানজটমুক্ত এবং বাসযোগ্য আধুনিক মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সবশেষে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি:
- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: প্রতিটি নাগরিকের ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
- গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: গণমাধ্যমের ওপর থেকে সব ধরণের অঘোষিত সেন্সরশিপ তুলে দেওয়া হবে এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল করা হবে।
- শহীদ তালিকা: মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের একটি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হবে।
বিএনপির এই ইশতেহার কেবল একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। তারেক রহমান তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, প্রতিশোধের রাজনীতি নয় বরং জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, সাধারণ ভোটাররা এই ইশতেহারকে কতটা সাদরে গ্রহণ করেন।








