হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Tuesday, September 1, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeআর্ন্তজাতিকনেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: কোন দেশের কতজন নিখোঁজ জানুন বিস্তারিত
spot_img

নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: কোন দেশের কতজন নিখোঁজ জানুন বিস্তারিত

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত শান্ত ও সুন্দর দেশ নেপাল এবং চীনের অধীনস্থ তিব্বত অঞ্চল আজ এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত, হিমবাহ ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। চারিদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর আর্তনাদ। উদ্ধারকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ তীব্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সবশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৯১৯ জনের নিশ্চিত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪,৭৯৩ জন মানুষ। এই বিপুল সংখ্যক নিখোঁজ মানুষের মধ্যে রয়েছেন দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক এবং স্থানীয় নিরাপত্তারক্ষীরা।

নিচে এই অভূতপূর্ব দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র এবং দেশভিত্তিক নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সহজ ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

মৃত্যুর মিছিল ও নিখোঁজের চিত্র: দুর্যোগের বর্তমান পরিস্থিতি

নেপাল ও তিব্বত—দুই অঞ্চলেই বন্যার তাণ্ডবে মানবীয় বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু নিখোঁজের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘতর হচ্ছে।

  • নেপালের পরিস্থিতি: নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখানে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪,২৪৭ জনে। এর মধ্যে অন্তত ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তবে প্রথম অবস্থায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
  • তিব্বতের পরিস্থিতি: চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির (CCTV) রিপোর্ট অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫৪৬ জন। এই নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।
  • ভারতের সীমান্ত এলাকা: নেপালি পর্বতমালা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদীগুলোর তোড়ে ভেসে এসেছে বহু মরদেহ। ভারতের সীমান্তবর্তী নদীগুলো থেকে এ পর্যন্ত ৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নেপালের বন্যায় ভেসে এসেই তারা মারা গেছেন। তবে আনুষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় ভারতের প্রশাসনিক তালিকায় এই সংখ্যা এখনো যুক্ত করা হয়নি।

নেপালে কর্মজীবী ও নিরাপত্তাকর্মীদের বড় ক্ষয়ক্ষতি

নেপালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু পর্যটন কেন্দ্রগুলোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও সরকারি বিভাগগুলোর ওপরও বড় আঘাত হেনেছে।

নেপাল সরকারের প্রকাশিত নিখোঁজের তালিকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন:

১. জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক: পাহাড়ি নদীর ওপর গড়ে ওঠা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত প্রায় ৯৩৩ জন কর্মী বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন।

২. নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য: উদ্ধারকাজে নেমে এবং পাহাড়ি ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালনকালে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫ জন সদস্য এবং পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশের ৩৮ জন সদস্য নিখোঁজ হয়েছেন।

৩. সরকারি কর্মকর্তা: সীমান্ত ও শুল্ক বিভাগের দায়িত্বে থাকা ১৮ জন অভিবাসন কর্মকর্তা পানির তোড়ে ভেসে গেছেন বা ভূমিধসে আটকা পড়েছেন।

৪. সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত জেলা: নেপালের নুয়াকোট জেলায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এককভাবে এই একটি জেলা থেকেই ১,১৫৮ জন মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া, তিব্বত অংশে কাজ করতে যাওয়া প্রায় ১০৪ জন নেপালি নাগরিক সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে চীনের সিসিটিভি।

কোন দেশের কতজন পর্যটক ও নাগরিক নিখোঁজ?

হিমালয় পর্বতমালা বিশ্বের ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক স্বপ্নের গন্তব্য। ট্রেকিং ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক নেপাল ও তিব্বতে আসেন। দুর্ভাগ্যবশত, দুর্যোগের সময় বহু বিদেশি নাগরিক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নেপাল পর্যটন বোর্ড এবং চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের যে তালিকা পাওয়া গেছে, তা নিচে দেওয়া হলো:

১. ভারত

ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে নেপালে সর্বদা বিপুল সংখ্যক ভারতীয় পর্যটক ও ব্যবসায়ী অবস্থান করেন।

  • নেপালে: ২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
  • তিব্বতে: ৪৯ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ।
  • আশার আলো: তিব্বতের একটি অংশে আটকা পড়া প্রায় ৯০০ জন ভারতীয় পর্যটক বর্তমানে নিরাপদে আছেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।

২. যুক্তরাষ্ট্র (আমেরিকা)

  • নেপালে: যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮৫ জন নাগরিক নিখোঁজ ছিলেন। তবে উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
  • তিব্বতে: আরও ১৮ জন মার্কিন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
  • বর্তমান আপডেট: মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

৩. ইউক্রেন

  • নেপালে ট্র্যাকিংয়ে গিয়ে ইউক্রেনের প্রায় ৬১ থেকে ৬২ জন নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন।
  • তিব্বত অংশে ইউক্রেনের ১ জন নাগরিকের নিখোঁজ থাকার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

৪. মালয়েশিয়া

  • নেপালে ভ্রমণরত ৫১ জন মালয়েশিয়ান নাগরিকের কোনো খোঁজ মিলছে না।
  • তিব্বতে ৩ জন মালয়েশিয়ান নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

৫. অস্ট্রেলিয়া

  • নেপাল ও তিব্বতের পাহাড়ি এলাকায় অ্যাডভেঞ্চার ট্র্যাকিংয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার মোট ৪২ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

৬. যুক্তরাজ্য (ব্রিটেন)

  • নেপালে ৩৩ জন ব্রিটিশ পর্যটক নিখোঁজ।
  • তিব্বত অংশে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক।

৭. কানাডা

  • কানাডার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন কানাডিয়ান নিখোঁজ। চীনা সংবাদমাধ্যম তিব্বত অংশে ৬ জন কানাডিয়ানের নিখোঁজের আলাদা তথ্য দিয়েছে।

৮. দক্ষিণ কোরিয়া

  • ঘুরতে আসা ৯ জন দক্ষিণ কোরিয়ান পর্যটক সম্পূর্ণ নিখোঁজ।
  • এছাড়া নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আরও ৯ জন কোরিয়ান কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

৯. রাশিয়া

  • নেপালে রাশিয়ার ৯ জন নাগরিক নিখোঁজ ছিলেন, যার মধ্যে ২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
  • তিব্বতে আরও ৩ জন রুশ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

১০. অন্যান্য ইউরোপীয় ও এশীয় দেশ

  • লাটভিয়া: নেপালে ২৯ জন এবং তিব্বতে ৩৩ জন।
  • জার্মানি: নেপালে ৮ জন এবং তিব্বতে ৩ জন।
  • সিঙ্গাপুর: ৯ জন নাগরিক নিখোঁজ।
  • দক্ষিণ আফ্রিকা: ১০ জন।
  • নিউজিল্যান্ড: ৭ জন।
  • ফ্রান্স: ৬ জন।
  • স্পেন, হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, কাজাখস্তান: প্রতিটি দেশের অন্তত ৪ জন করে নাগরিক নিখোঁজ।
  • ইতালি: ৩ জন।
  • ফিনল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া: প্রতিটি দেশের ২ জন করে নাগরিক নিখোঁজ।
  • বেলারুশ, ইসরাইল, ফিলিপাইন, সার্বিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ভিয়েতনাম: এসব দেশের ১ জন করে নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

পরিসংখ্যানের তফাৎ ও উদ্ধার অভিযানের বর্তমান অবস্থা

বিভিন্ন দেশের সরকারি দপ্তর, নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড এবং চীন সরকারের দেয়া নিখোঁজের তথ্যে কিছুটা তফাৎ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত তথ্য পেতে দেরি হচ্ছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ভাঙা রাস্তা এবং ক্রমাগত বৃষ্টিপাতের কারণে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বল এবং চীনের উদ্ধারকারী দল ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।

নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় নিখোঁজ ও মৃত্যুর এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। বিশ্বনেতারা এই কঠিন সময়ে নেপাল ও চীনের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন এবং জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।


হিমালয় অঞ্চলের এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আমাদের আবারো প্রকৃতির নির্মম রূপের কথা মনে করিয়ে দিল। শত শত পরিবার আজ তাদের প্রিয়জনের ফিরতি পথের দিকে তাকিয়ে আছে। নিখোঁজ পর্যটক ও স্থানীয় মানুষদের দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হোক বিশ্ববাসী আজ এই প্রার্থনাই করছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!