রাজধানীর গাবতলী-মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পাশে অবস্থিত বিজিবি মার্কেট এলাকায় প্রতিদিন সকালে জমে ওঠে এক ব্যস্ত বাজার। সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় বিক্রি হয় প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ।
এ আড়তে প্রতিদিন দেখা যায় নানা প্রজাতির দেশি ও বিদেশি মাছের ভিড়। গরিবের প্রিয় পাঙাশ থেকে শুরু করে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, কই, শিং, টাকি, মাগুর, পুঁটি, বাইম ও চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ এখানে বিক্রি হয়। এছাড়া সাগরের বাইলা, চাপিলা, সুরমা, পোয়া, রিঠা, লইট্টা, টুনা সবই পাওয়া যায় একই জায়গায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশ থেকেও এখানে মাছ আসে। ওমান, চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা সামুদ্রিক মাছ সরাসরি দ্বীপনগর আড়তে পৌঁছে যায়।
২০০৯ সালে সূচনা, আজ দেশের বৃহত্তম পাঙ্গাশ আড়ত
দ্বীপনগর আড়তের সূচনা ২০০৬ সালে বিজিবি মার্কেটে শুরু হয় অল্প পরিসরে মাছ বিক্রির মাধ্যমে। কিন্তু প্রকৃতভাবে এটি আড়তের রূপ নেয় ২০০৯ সালে। শুরুতে ব্যবসা ছোট থাকলেও ২০১৫ সালের পর বাজার জমে ওঠে।
এরপর পাঁচটি হিমাগার ও একটি বরফকল গড়ে ওঠে, যা এখন পূর্ণাঙ্গ মৎস্য আড়তে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০০টি পাইকারি দোকান রয়েছে।
‘অটুট বন্ধন মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতি’র সভাপতি মো. ইনসার জানান, প্রতিদিন এখানে প্রায় ৪০ হাজার কেজি পাঙ্গাশ বিক্রি হয়, যা কারওয়ান বাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। সব ধরনের মাছ মিলিয়ে দৈনিক বিক্রি হয় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ।
পাইকারদের আকর্ষণ কম দাম ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ
দ্বীপনগর আড়তের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর সুবিধাজনক পরিবেশ। জ্যান্ত মাছের পাইকারদের জন্য এখানে বিনা মূল্যে পানি সরবরাহ করা হয়, ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।
এখানে ওজনে কম দেওয়া, চুরি বা জালিয়াতির অভিযোগ নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি সম্পূর্ণ চাঁদাবাজিমুক্ত আড়ত। পাইকাররা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারেন।
ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, শ্যামলী, সাভার, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুর এলাকার পাইকাররা প্রতিদিন এখানে মাছ কিনতে আসেন।
তিন ঘণ্টার বেচাকেনা, কোটি টাকার লেনদেন
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকারেরা ট্রাকভর্তি মাছ নিয়ে দ্বীপনগরে পৌঁছে যান। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় নিলামের হাঁকডাক। তিন ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সব বেচাকেনা।
এই সময়ের মধ্যেই প্রায় আড়াই কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। ৯টার পর থেকেই শুরু হয় ধোয়ামোছার কাজ, বরফ সংরক্ষণ ও পরদিনের প্রস্তুতি।
সাভার নবীনগর থেকে আসা পাইকার ফরিদুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতিদিন ১৫০–২০০ কেজি সামুদ্রিক মাছ এখান থেকে কিনে নিজের এলাকার বাজারে বিক্রি করেন।
পাঙ্গাশের আড়তে প্রতিদিন আসে ৩৫–৪০ ট্রাক মাছ
আড়তদারদের হিসাবে, প্রতিদিন দ্বীপনগরে আসে ৩৫ থেকে ৪০টি ট্রাক পাঙ্গাশ মাছ। প্রতিটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০টি ড্রাম থাকে এবং প্রতিটি ড্রামে প্রায় ৪০ কেজি মাছ।
হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন প্রায় ৪৯ হাজার কেজি পাঙ্গাশ বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এটি দেশের অন্য কোনো আড়তে সম্ভব হয় না।
সেই কারণে ব্যবসায়ীরা একে এখন দেশের বৃহত্তম পাঙ্গাশ আড়ত বলে দাবি করছেন।
দেশি ও বিদেশি মাছের মিলনমেলা
দ্বীপনগরে শুধু দেশের বিভিন্ন জেলার মাছই আসে না, বরং এখানে পাওয়া যায় বিদেশি সামুদ্রিক মাছও।
দেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, রাজশাহী, খুলনা, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, নওগাঁ, মোংলা ও টেকেরহাট থেকে প্রতিদিন আসে মিঠাপানি ও নদীর মাছ।
অন্যদিকে ওমান, সুদান, জর্ডান, চীন, ভারত ও জাপান থেকেও আমদানি হয় সাগরের নানা প্রজাতির মাছ, যেমন টুনা, লইট্টা, পোয়া, বাইলা ও সুরমা।
এই বৈচিত্র্যই দ্বীপনগরকে করেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি মাছের কেন্দ্র।
মাছ সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা
দ্বীপনগর আড়তের ভেতরে রয়েছে পাঁচটি হিমাগার ও একটি বরফকল, যা মাছ সংরক্ষণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
মেসার্স ঢাকা গাবতলী ফিশ আড়তের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুল্লাহ জানান, তাঁদের হিমাগারে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ টন মাছ বিক্রি হয়, যার দাম পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত।
হিমাগারে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাছ সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে আরও কমিয়ে ২ মাস পর্যন্ত মাছ ঠিক রাখা সম্ভব।
কম দামে বরফ, বাড়তি লাভ
দ্বীপনগর আড়তের সাবেক সভাপতি মনির হোসেন জানান, তাঁর নিজস্ব বরফকল থাকায় পাইকাররা এখানে কম দামে বরফ পেয়ে যান। ৯০ থেকে ১০০ টাকায় একটি বরফের পাটা পাওয়া যায়, ফলে বাইরে থেকে বরফ আনতে হয় না।
তিনি বলেন, “কম দামে মাছ ও বরফ পাওয়ায় পাইকাররা এখন কারওয়ান বাজারের পরিবর্তে দ্বীপনগরে আসছেন।”
একজন পাইকার জানান, তিনি বাইম মাছ ৫৫০ টাকায় কিনে ৬০০–৬৫০ টাকায় বিক্রি করেন। পোয়া মাছ ৩৩০ টাকায় কিনে ৩৫০–৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। এই দামে ভালো লাভ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এখানে আসেন।
ঢাকার মাছ বেচাকেনায় নতুন কেন্দ্রবিন্দু
দ্বীপনগর আড়ত এখন শুধু একটি বাজার নয়, বরং ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেনে ব্যস্ত এই আড়তে হাজারো শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জীবিকা নির্বাহ করেন।
চাঁদাবাজিমুক্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ভালো সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সহজ যোগাযোগের কারণে এটি এখন রাজধানীর মাছ বেচাকেনার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
দ্বীপনগর মাছের আড়ত এখন দেশের সবচেয়ে বড় পাঙ্গাশ বেচাকেনার কেন্দ্র। মাত্র তিন ঘণ্টায় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয় এখানে, যা দেশের মৎস্যবাজারের শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরে।
এ আড়তের সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করলে ছোট বাজারও দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।








