আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। ‘নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার’ শিরোনামের এই ইশতেহারে আগামী ৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ২৬টি অগ্রাধিকার এবং ৮টি ভাগে মোট ৪১টি সুনির্দিষ্ট দফার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।
ইশতেহারে জামায়াতের ২৬টি প্রধান অগ্রাধিকার
জামায়াত তাদের ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনকল্যাণে ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
- জাতীয় স্বার্থে আপসহীনতা: দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ধরনের আপস না করা।
- যুবকদের প্রাধান্য: রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের অগ্রাধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
- নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা: কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নারীর জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র: সৎ নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সব পর্যায়ে দুর্নীতি নির্মূল করা।
- স্মার্ট ও ডিজিটাল বাংলাদেশ: প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।
- জুলাই বিপ্লবের প্রতিফলন: ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসন।
অর্থনৈতিক বিপ্লব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ইশতেহারে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে এবং বেকারত্ব দূর করতে বৈপ্লবিক কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আস্থা পুনরুদ্ধার
বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কঠোর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেশি-বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
২. বেকারত্ব দূর ও বিনা মূল্যে চাকরির আবেদন
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সরকারি চাকরিতে আবেদনের ফি পুরোপুরি মওকুফ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করে সব ধরনের বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে।
৩. কৃষি ও শিল্পায়ন
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার
গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে ইশতেহারে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যুগান্তকারী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সমানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি (PR System)
জামায়াতে ইসলামী ইশতেহারে সমানুপাতিক (Proportional Representation) পদ্ধতিতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছে। এর ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পাবে, যা দেশের গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করবে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের বিচার ও মানবাধিকার
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হওয়া গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং জুলাই যোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদানকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে পালন করা হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা। জামায়াত তাদের ইশতেহারে শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করার অঙ্গীকার করেছে।
- বিনামূল্যে শিক্ষা: পর্যায়ক্রমে দেশের সকল স্তরের শিক্ষা অবৈতনিক বা বিনামূল্যে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- নৈতিক ও আধুনিক শিক্ষা: সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদার সাথে মিল রেখে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে।
- স্বাস্থ্যসেবা: গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপদ যাতায়াত ও পরিবেশ রক্ষা
যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় জামায়াতের রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
৩ ঘণ্টার মধ্যে বিভাগীয় শহর
রাজধানী ঢাকার সাথে প্রতিটি বিভাগীয় শহরের দূরত্ব কমিয়ে আনতে সড়ক ও রেলপথকে আধুনিকায়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো দেশের যেকোনো বিভাগীয় শহর থেকে ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
তিন শূন্য ভিশন (Three Zero Vision)
পরিবেশ রক্ষায় ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এটি হলো:
১. পরিবেশগত শূন্যতা (Zero Environmental Degradation)
২. বর্জ্যের শূন্যতা (Zero Waste)
৩. বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা (Zero Flood Risk)
সংখ্যালঘু নয়, নাগরিক অধিকারই মুখ্য
জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কেউ ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং সবাই বাংলাদেশের সমান নাগরিক হিসেবে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার ভোগ করবে। পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলোর জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।
কেমন হবে আগামীর বাংলাদেশ?
জামায়াতে ইসলামীর এই নির্বাচনী ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ। প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে একতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে দেশ গড়ার যে ডাক আমির ডা. শফিকুর রহমান দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ৫ আগস্টের বিপ্লব পরবর্তী এই সময়ে জামায়াতের এই ইশতেহার ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।








