পবিত্র রমজান মাস ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময়। বছরের অন্য এগারো মাসের তুলনায় এই মাসে মুমিন মুসলমানদের ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা দেখি, যারা সারা বছর নিয়মিত নামাজ পড়তে পারেন না, তারাও রমজান মাসে পরম মমতায় মসজিদের দিকে ছুটে যান। রমজানের শুরুতে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড় আমাদের ধর্মীয় উদ্দীপনারই পরিচয় দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.), তাঁর প্রিয় সাহাবীগণ এবং পরবর্তী যুগের নেককার ব্যক্তিরা পুরো রমজান মাস ইবাদতের সাগরে ডুব দিয়ে কাটাতেন। আমরাও যদি এই রমজানকে সার্থক করতে চাই, তবে কিছু বিশেষ রমজানের আমল আমাদের নিয়মিত করা উচিত। চলুন জেনে নিই সেই ৪টি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে।
১. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা
রমজান মাস মূলত কুরআন নাজিলের মাস। আল্লাহ তাআলা এই মাসেই মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। তাই এই মাসে কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করাই হলো শ্রেষ্ঠ আমল।
কুরআনের গুরুত্ব: সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
“রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, মানুষের জন্য হেদায়েত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।”
নবীজির সুন্নাহ: হাদিসে এসেছে, প্রতি রমজানে জিবরিল (আ.) নবীজি (সা.)-কে একবার কুরআন শোনাতেন। আর নবীজির ইন্তেকালের বছরে তিনি দুইবার কুরআন শোনান। (বুখারি: ৬২৮৫)। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় হলেও কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। যদি কেউ কুরআন পড়তে না জানেন, তবে অন্তত শেখার চেষ্টা করাও বড় একটি আমল।
২. অকাতরে দান-সদকা করা
দান করা মুমিনের চিরস্থায়ী স্বভাব, তবে রমজানে এর গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আপনি যদি রমজানের আমল হিসেবে দান-সদকাকে বেছে নেন, তবে আল্লাহ আপনার সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন।
রাসুল (সা.)-এর দানশীলতা: সহিহ বুখারির বর্ণনা মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর যখন রমজান মাস আসত, তিনি বাতাসের বেগে দান করতেন। তাঁর দানশীলতা তখন সব সীমা ছাড়িয়ে যেত।
কেন দান করবেন: আপনার সামান্য একটি টাকা বা এক বেলা খাবার হতে পারে কোনো গরিব মানুষের ইফতারের হাসি। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় (সুরা বাকারা: ২৬১)। তাই এই মাসে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের অন্যতম প্রধান কাজ।
৩. ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা
মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করি, ছোট-বড় গুনাহে জড়িয়ে পড়ি। শয়তানের প্ররোচনা আর নফসের তাড়নায় আমরা আল্লাহর অবাধ্য হই। কিন্তু রমজান হলো সেই গুনাহ ধুয়ে ফেলার শ্রেষ্ঠ সময়।
ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ: আল্লাহ তাআলা সুরা নূহে বলেছেন, “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল।”
ইস্তেগফারের ফজিলত: নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং তাকে অভাবনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন (আবু দাউদ: ১৫১৮)। বিশেষ করে ইফতারের আগের সময় এবং শেষ রাতে সেহরির সময় হাত তুলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ নিরাশ করেন না।
৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া করা
রমজানের প্রতি রাতে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। দনিুয়াবি অনেক চাওয়া আমাদের থাকতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো জাহান্নাম থেকে বাঁচা এবং জান্নাত লাভ করা।
সাফল্যের সংজ্ঞা: কুরআনে বলা হয়েছে, “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃত সফলতা লাভ করবে।” (সুরা আল-ইমরান: ১৮৫)।
কিভাবে আমল করবেন: রমজানের দিনগুলোতে এবং বিশেষ করে বিজোড় রাতগুলোতে আল্লাহর কাছে বারবার বলুন ‘হে আল্লাহ, আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন।’ রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ প্রতি রাতেই অনেককে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন (তিরমিজি: ৬৮২)। এই সুযোগ যেন আমরা হাতছাড়া না করি।
রমজান হোক পরিবর্তনের মাস
রমজান শুধু না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ। উপরোক্ত ৪টি আমল, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, ইস্তেগফার এবং মুক্তির দোয়া করার মাধ্যমে আমরা আমাদের রমজানকে অর্থবহ করে তুলতে পারি। আসুন, এই বরকতময় মাসকে অবহেলায় না কাটিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে সঁপে দিই।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের এই পবিত্র আমলগুলো করার তৌফিক দান করুন। আমিন।








