আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আবারও গভীর সংকটের মুখে। জুন ২০২৫ প্রান্তিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।
খেলাপি ঋণই মূল কারণ
মূলধন ঘাটতির পেছনে প্রধান কারণ হলো ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। গত কয়েক বছরে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও জবাবদিহিতার অভাবে ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ।
এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো যথাযথ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (Provision) রাখতে পারছে না। ফলে তাদের মূলধন প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে এবং ঘাটতি বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন,
“খেলাপি ঋণ এখন শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়, এটি সমগ্র অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ও দুর্বলতা
বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর মূলধন পর্যাপ্ততার (Capital Adequacy) নিয়ম নির্ধারণ করেছে।
ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত আছে:
- ১০% মূলধন সংরক্ষণ অনুপাত (MCR)
- ২.৫% ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার (CCB)
- Basel III কাঠামো অনুসারে লিভারেজ অনুপাত রক্ষা
তবে জুন প্রান্তিকে ২৪টি ব্যাংক এসব নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তাদের মূলধন ঘাটতি আরও গভীর হয়েছে।
এতে নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষতা ও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নর বলেন,
“যদি নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হতো, তাহলে ২৪টি ব্যাংক একসঙ্গে এমন সংকটে পড়ত না।”
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক
মূলধন ঘাটতির তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি এবং বিশেষায়িত দুটি ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ২১টি ব্যাংকও একই অবস্থায় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে রয়েছে:
- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি
- জনতা ব্যাংক: প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি
- ইউনিয়ন ব্যাংক: প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি
- ন্যাশনাল ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ: এরও তাৎপর্যপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় দেওয়াই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও জনআস্থা সংকট
মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলো সাধারণত শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না, এমনকি নতুন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনেও এসব ব্যাংক সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
এই অবস্থায় গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদি ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হয়, তাহলে তারল্য সংকট (Liquidity Crisis) সৃষ্টি হতে পারে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দেবে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন,
“ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সরকারের করণীয় ও সম্ভাব্য সমাধান
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যেমন:
- দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা (Merger)
- খেলাপি ঋণ পুনঃতালিকাভুক্তির নীতিমালা শক্ত করা
- পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা বাড়ানো
- Basel III মানদণ্ড বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব উদ্যোগ কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি
যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে:
- ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং নেমে যাবে
- বৈদেশিক বিনিয়োগ কমবে
- আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়বে
- টাকার মানে চাপ সৃষ্টি হবে
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, “এখনই কঠিন সিদ্ধান্ত না নিলে আর্থিক খাতের পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হয়ে পড়বে।”
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গুরুতর বাস্তবতার মুখে। খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির কারণে ২৪টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, যার পরিমাণ ১.৫ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।
এ পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক খাত নয়, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই এই সংকট মোকাবেলার একমাত্র পথ।








