অনেকেই অবাক হন, ব্যাংকে টাকা রাখলে আবার কেন কর দিতে হবে! আসলে এটি সরাসরি কর নয়, বরং “আবগারি শুল্ক” নামে একধরনের পরোক্ষ কর। এই শুল্ক মূলত সরকার নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক লেনদেন বা সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধার্য করে।
যেমন: ব্যাংক হিসাব, মুঠোফোন সেবা, সিগারেট, বিলাসপণ্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকার এ কর আরোপ করে থাকে।
আবগারি শুল্ক কী?
আবগারি শুল্ক হলো এক ধরনের পরোক্ষ কর যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় বা মুনাফার ওপর নয়, বরং নির্দিষ্ট কার্যকলাপ বা সুবিধা ব্যবহারের ওপর বসে। সাধারণ করের মতো এটি আয়কর নয়।
ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই শুল্কটি আপনার আমানতের পরিমাণের ওপর ধার্য হয়। এর মানে হলো, আপনি যখন ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করছেন (যেমন টাকা জমা রাখা, লিকুইডিটি বা তারল্য সুবিধা, এবং নিরাপত্তা) তখন এই শুল্কটি প্রযোজ্য হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই শুল্ক আদায় করে এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়।
আবগারি শুল্ক কেবল ব্যাংকিং ক্ষেত্রেই নয়, বরং সিগারেট, মুঠোফোন সেবা, বিলাসপণ্য এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট সেবার ক্ষেত্রেও সরকার আরোপ করে থাকে। এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় খাত।
কেন সরকার এই শুল্ক নেয়?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আবগারি শুল্ক ধার্যের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য তুলে ধরে:
১. রাজস্ব আয়ের উৎস বৃদ্ধি: সরকারের বার্ষিক বাজেট এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের জন্য এটি একটি স্থিতিশীল এবং নিশ্চিত রাজস্ব আয়ের উৎস। বছরে এই খাত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা সংগৃহীত হয়।
২. উচ্চ আয়ের করদাতাদের করজালে আনা: আবগারি শুল্কের হার আমানতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে বাড়ানো হয়। এর মাধ্যমে মূলত উচ্চ পরিমাণ আমানতকারীদের চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক লেনদেনের ওপর পরোক্ষ নজরদারি নিশ্চিত করা হয়।
৩. আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা: এই শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংক লেনদেনের একটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
পরিবর্তিত নিয়মাবলী
আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে। আগে নিয়ম ছিল যে ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকার বেশি থাকলেই আবগারি শুল্ক কাটা হতো। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে এই সীমা বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকার বেশি থাকলেই আবগারি শুল্ক কাটা হবে।
এই সীমা বৃদ্ধির ফলে দেশের একটি বড় অংশের সাধারণ ব্যাংক গ্রাহকের ওপর থেকে শুল্কের চাপ কমেছে। নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের যে সকল গ্রাহক সামান্য সঞ্চয় করেন, তারা এখন শুল্ক কর্তনের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত।
কত টাকা থাকলে কত শুল্ক দিতে হবে
আবগারি শুল্কের পরিমাণ ব্যাংকে বছরের একবারের জন্য সর্বোচ্চ স্থিতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ, বছরের যেকোনো সময়ে যদি আপনার হিসাবের স্থিতি একবার নির্ধারিত সীমা স্পর্শ করে, তবেই সেই হারে শুল্ক কাটা হবে।
| ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ স্থিতি (বছরে একবার) | আবগারি শুল্কের পরিমাণ |
| ৩ লাখ টাকার নিচে | কোনো শুল্ক নয় |
| ৩,০০,০০১ – ৫ লাখ টাকা | ১৫০ টাকা |
| ৫,০০,০০১ – ১০ লাখ টাকা | ৫০০ টাকা |
| ১০,০০,০০১ – ৫০ লাখ টাকা | ৩,০০০ টাকা |
| ৫০,০০,০০১ – ১ কোটি টাকা | ৫,০০০ টাকা |
| ১ কোটি ১ টাকা – ২ কোটি টাকা | ১০,০০০ টাকা |
| ২ কোটি ১ টাকা – ৫ কোটি টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| ৫ কোটি টাকার বেশি | ৫০,০০০ টাকা |
শুল্ক কর্তনের প্রক্রিয়া ও হিসাবসমূহ
কখন এই শুল্ক কাটা হয়?
আবগারি শুল্ক সাধারণত প্রতি বছর একবার কাটা হয়। ব্যাংকগুলো সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে গ্রাহকদের হিসাব পর্যালোচনা করে। যদি বছরের যেকোনো সময় আপনার হিসাবের স্থিতি নির্ধারিত সীমা স্পর্শ করে থাকে, তবে সেই হিসাব অনুযায়ী শুল্ক কর্তন করা হয়। অনেক সময় প্রক্রিয়াগত কারণে ব্যাংক জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও এই শুল্ক কেটে নেয়।
কোন কোন হিসাব থেকে শুল্ক কাটা হয়?
অনেকের ধারণা, আবগারি শুল্ক কেবল সঞ্চয়ী হিসাব থেকেই কাটা হয়। কিন্তু এই শুল্ক ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক হিসাবে প্রযোজ্য:
- সঞ্চয়ী হিসাব (Savings Account)
- চলতি হিসাব (Current Account)
- স্থায়ী আমানত (Fixed Deposit বা এফডিআর)
- ডিপিএস (Deposit Pension Scheme)
- বেতনভিত্তিক হিসাব (Salary Account)
- অন্যান্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি আমানত।
সুতরাং, আপনার কোনো একটি হিসাবেও যদি নির্ধারিত সীমার বেশি টাকা জমা থাকে, তাহলে সেই হিসাব থেকে শুল্ক কাটা হবে।
একাধিক ব্যাংক হিসাবে শুল্ক কাটা
এই নিয়মটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: যদি একজন গ্রাহকের একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকে, তবে প্রতিটি হিসাবে আলাদাভাবে শুল্ক কাটা হবে।
উদাহরণস্বরূপ: ধরুন, আপনার তিনটি ভিন্ন ব্যাংকে তিনটি হিসাব রয়েছে এবং প্রত্যেকটিতে ৪ লাখ টাকা করে জমা আছে (মোট ১২ লাখ টাকা)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ৩,০০,০০১ – ৫ লাখ টাকার স্থিতির জন্য প্রতি হিসাবে ১৫০ টাকা করে শুল্ক প্রযোজ্য। সুতরাং, আপনাকে প্রতিটি হিসাবের জন্য ১৫০ টাকা করে, অর্থাৎ মোট ৪৫০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। এটি প্রমাণ করে যে শুল্কটি গ্রাহকের মোট সম্পদের ওপর নয়, বরং ব্যাংকিং সুবিধার ওপর ধার্য করা হয়।
আবগারি শুল্ক ব্যবস্থাটি মূলত আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং উচ্চ আমানতকারীদের একটি নির্দিষ্ট করজালের মধ্যে আনার জন্য সরকারের একটি কৌশল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শুল্কের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করায় এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপটি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বস্তি এনেছে এবং প্রমাণ করে যে সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে কিছুটা হলেও সচেতন হয়েছে।
তাই, একজন সচেতন গ্রাহক হিসেবে আপনার ব্যাংক হিসাবের স্থিতি তিন লাখ টাকার বেশি হলে, ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে আপনার হিসাব থেকে শুল্ক কাটা হতে পারে, এই বিষয়ে অবগত থাকা জরুরি। এটি কোনো ‘সরাসরি কর’ নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আপনার একটি পরোক্ষ অংশগ্রহণ।








