আজকাল বাস, ট্রেন, অফিস কিংবা ব্যায়ামাগার—সবখানেই মানুষের কানে একটি জিনিস প্রায় সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তা হলো ইয়ারবাড। প্রিয় গান শোনা, পছন্দের কোনো পডকাস্ট উপভোগ করা কিংবা কাজের সুবিধার্থে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা সবকিছুতেই আমরা ইয়ারবাডের ওপর ভীষণভাবে নির্ভর হয়ে পড়েছি। কিন্তু এই ছোট্ট প্রযুক্তিটি কি আমাদের অজান্তেই কানের মারাত্মক ক্ষতি করছে?
সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দে ইয়ারবাড ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে মানুষের কানের শোনার ক্ষমতা বা শ্রবণশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আজকের এই বিশেষ নিবন্ধে আমরা জানবো ইয়ারবাড কীভাবে কানের ক্ষতি করে, গবেষণায় কী তথ্য পাওয়া গেছে, দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার নিরাপদ এবং কীভাবে কান ভালো রাখবেন।
ইয়ারবাড কীভাবে আমাদের কানের ক্ষতি করে?
আমরা যখন সাধারণ কোনো স্পিকার বা দূর থেকে আসা কোনো শব্দ শুনি, তখন শব্দতরঙ্গ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কানের ভেতরের পর্দায় পৌঁছায়। কিন্তু ইয়ারবাড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা।
ইয়ারবাড সরাসরি কানের নালীর ভেতরে বসানো থাকে। ফলে শব্দ কানের পর্দার খুব কাছাকাছি পৌঁছায় এবং সরাসরি তীব্র তরঙ্গ তৈরি করে। এটি মূলত কয়েকভাবে কানের ক্ষতি করে:
১. ভেতরের ক্ষুদ্র হেয়ার সেল বা কোষের বিনাশ
আমাদের কানের ভেতরের অংশে (অন্তঃকর্ণে) হাজার হাজার অতিক্ষুদ্র ‘হেয়ার সেল’ বা সংবেদনশীল কোষ থাকে। এই কোষগুলোর প্রধান কাজ হলো শব্দকে স্নায়ুসংকেতে রূপান্তর করে আমাদের মস্তিষ্কে পাঠানো, যার ফলে আমরা শব্দ শুনতে ও বুঝতে পারি।
যখন অতিরিক্ত উচ্চমাত্রার শব্দ সরাসরি ইয়ারবাডের মাধ্যমে কানে প্রবেশ করে, তখন এই সূক্ষ্ম কোষগুলো প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, মানবদেহের এই কোষগুলো একবার ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে গেলে তা আর কখনোই পুনরায় জন্মায় না বা ভালো হয় না। অর্থাৎ, এর ফলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে কমে যায়।
২. শব্দ কানের পর্দার অনেক বেশি কাছে থাকা
বাহ্যিক স্পিকারের তুলনায় ইয়ারবাড কানের পর্দার অনেক কাছাকাছি থাকে। একই ভলিউমে বাইরের স্পিকার থেকে আমরা যে শব্দ পাই, ইয়ারবাডের মাধ্যমে তা কানের ভেতরের পর্দায় অনেক বেশি শক্তিতে আঘাত করে। ফলে কানকে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি ধকল সহ্য করতে হয়।
৩. কান বিশ্রাম না পাওয়া
অনেকেই আছেন যারা কাজের ফাঁকে বা রাতে ঘুমানোর সময় একটানা কয়েক ঘণ্টা ইয়ারবাড কানে দিয়ে রাখেন। মাঝপছন্দের ভলিউম হলেও, একটানা ব্যবহারের ফলে কান কোনো বিশ্রাম পায় না। কানের পেশি ও কোষগুলো একটানা চাপে থাকার কারণে ক্লান্তি ও সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে।
৪. কান বন্ধ হওয়া ও কানের খৈল জমে যাওয়া
ইয়ারবাড কানের নালী বা এয়ার ক্যানেলকে পুরোপুরি ব্লক করে রাখে। এর ফলে কানে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহারের কারণে কানের প্রাকৃতিক খৈল (Earwax) ভেতরের দিকে জমা হতে থাকে। এতে কান ভারী লাগা, কান বন্ধ হয়ে আসা এবং সাময়িক কালা হয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভীতিকর তথ্য
ইয়ারবাড ও ব্লুটুথ এয়ারফোনের অতিব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এসব গবেষণার ফলাফল কান বিশেষজ্ঞদের বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
- বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও পর্যালোচনার ফল: ২০২২ সালে বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘কিউরিয়াস’ (Cureus)-এ প্রকাশিত একটি সমন্বিত গবেষণায় আন্তর্জাতিক গবেষকরা বিশ্বজুড়ে সম্পন্ন হওয়া ২৩টি আলাদা গবেষণা পরীক্ষা করেন। তারা দেখতে পান, ব্যক্তিগত মিউজিক প্লেয়ার ও হেডফোনের ভলিউম সাধারণত ৭৮ থেকে ১৩৬ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। উল্লেখ্য, ৮৫ ডেসিবেলের ওপর যেকোনো শব্দ টানা শুনলে কানের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
- শিক্ষার্থী ও তরুণদের ওপর প্রভাব: গবেষণায় দেখা গেছে, যেসকল শিক্ষার্থী প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ইয়ারফোন ব্যবহার করে, তাদের শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার হার স্বাভাবিক ব্যবহারকারীদের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
- কোলাহলপূর্ণ স্থানে উচ্চ ভলিউমের বিপদ: অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর-কিশোরী কোলাহলপূর্ণ জায়গায় কানের পারিপার্শ্বিক শব্দ বন্ধ করতে গিয়ে ইয়ারবাডের ভলিউম অনেক বাড়িয়ে দেয়, তাদের কানে শোনার সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি চার গুণেরও বেশি বেড়ে যায়।
দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার করা নিরাপদ?
কানে হেডফোন বা ইয়ারবাড পরা যাবে না—বিষয়টি এমন নয়। আধুনিক জীবনে কাজের খাতিরে আমাদের এটি ব্যবহার করতেই হয়। তবে প্রশ্ন হলো, সারাদিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড পরা নিরাপদ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘৬০/৬০ নিয়ম’ (60/60 Rule) মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
‘৬০/৬০ নিয়ম’ কী?
- ৬০% ভলিউম: আপনার ফোনের সর্ব্বোচ্চ শব্দমাত্রার ৬০ শতাংশের বেশি ভলিউমে কখনোই গান বা কথা শুনবেন না।
- ৬০ মিনিট সময়: একটানা সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারবাড কানে রাখবেন না। ১ ঘণ্টা পর অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য কানকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিন।
জার্নাল অফ অডিওলজি অ্যান্ড অটোলজিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একটানা এক ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করেন, তাদের কানে ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণের হার অনেক বেশি।
কানের সংক্রমণে ইয়ারবাডের ভূমিকা
ইয়ারবাড শুধুমাত্র কানের শোনার ক্ষমতাই কমায় না, বরং কানের ভেতরের ত্বকে নানান জীবাণু সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করে।
১. বাতাস চলাচলে বাধা: ইয়ারবাড কানে গুঁজে রাখার ফলে কান ভেতর থেকে ঘামতে শুরু করে। আর্দ্র ও উষ্ণ পরিবেশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ জায়গা।
২. ইয়ারবাড শেয়ার করার বিপদ: নিজের ইয়ারবাড অন্য বন্ধুকে দেওয়া বা অন্যেরটা নিজে ব্যবহার করার মাধ্যমে খুব সহজে এক কান থেকে অন্য কানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে।
৩. কানের সংক্রমণ ও চুলকানি: নোংরা ইয়ারবাড নিয়মিত ব্যবহারে কানের নালীতে তীব্র চুলকানি, ব্যথা ও পুঁজ জমার মতো ইনফেকশন হতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন আপনার কানের ক্ষতি হচ্ছে? (লক্ষণসমূহ)
আপনার অজান্তেই কানের ক্ষতি হচ্ছে কিনা তা কিছু লক্ষণের মাধ্যমে বোঝা যায়। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে:
- আপনার কানে একটানা বাঁশি বাজার মতো বা ঝিঁঝিঁ পোকার মতো ‘রিংগিং’ (Tinnitus) শব্দ হওয়া।
- কেউ কথা বললে মনে হওয়া তারা অস্পষ্ট বা ফিসফিস করে কথা বলছে।
- যেকোনো মানুষের কথা বারবার জিজ্ঞেস করতে হওয়া (যেমন: “কী বললেন?”, “আবার বলুন তো?”)।
- আশেপাশের কোলাহলের মধ্যে একজনের কথা আলাদা করে বুঝতে না পারা।
- গান শোনা শেষ করার পর কান বন্ধ বা ভারী হয়ে থাকা।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ইয়ারবাড ব্যবহারের সময় কানের যত্ন নেওয়ার কিছু সহজ টিপস
আমরা প্রযুক্তি বর্জন করতে পারব না, তবে সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে কানকে সুরক্ষিত রাখতে পারি। জেনে নিন সহজ কিছু উপায়:
১. নয়েজ ক্যানসেলেশন (Noise Cancellation) ব্যবহার করুন: সম্ভব হলে নয়েজ ক্যানসেলেশন প্রযুক্তির ইয়ারবাড ব্যবহার করুন। এতে বাইরের শব্দ কমার কারণে আপনাকে বাধ্য হয়ে ফোনের ভলিউম বাড়াতে হবে না।
২. ওভার-ইয়ার হেডফোন বেছে নিন: সরাসরি কানের নালীতে ঢোকে এমন ইয়ারবাডের চেয়ে পুরো কান ঢেকে রাখে এমন ‘ওভার-ইয়ার হেডফোন’ (Over-ear Headphones) কানের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর।
৩. ইয়ারবাড পরিষ্কার রাখুন: সপ্তাহে অন্তত একদিন নরম সুতি কাপড় বা আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল দিয়ে ইয়ারবাডের রাবার ও সামনের অংশ পরিষ্কার করুন।
৪. পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন: ফোন কল বা গান শোনা শেষে অবশ্যই ইয়ারবাড খুলে রাখুন। কানের ভেতরের বাতাস চলাচলের সুযোগ দিন।
৫. ঘুমের সময় ব্যবহার পরিহার করুন: রাতে ইয়ারবাড কানে দিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস অত্যন্ত ভয়াবহ। ঘুমানোর সময় কানকে সম্পূর্ণ শান্ত ও চাপমুক্ত রাখা উচিত।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ ও আনন্দময় করার জন্য এসেছে, আমাদের ক্ষতি করার জন্য নয়। ইয়ারবাড ব্যবহারের সুবিধাকে আমরা উপভোগ করব, তবে নিজের শারীরিক সুস্থতাকে বাজি রেখে নয়। সঠিক নিয়ম ও সচেতনতা মেনে চললে আমরা শোনার ক্ষমতা ঠিক রেখে দীর্ঘদিন ইয়ারবাড ব্যবহার করতে পারব। আজ থেকেই ৬০/৬০ নিয়ম মেনে চলুন এবং নিজের পাশাপাশি প্রিয়জনদের কানের যত্ন নিতে উৎসাহিত করুন।








