বাংলাদেশের সাতক্ষীরার একটি ছোট গ্রাম, তালা উপজেলার শিবপুর। এখানেই জন্ম নিয়েছে এমন এক শিশু, যার নাম এখন শুধু গ্রামেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনায়। মাত্র আট মাস বয়সেই সে পেয়েছে এমন একটি স্বীকৃতি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম, ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’।
শিশুটির নাম আয়ান খান রুহাব। জন্মের পর থেকেই তার জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সচেতনতার গল্প যেন এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা। তার বাবা ইমরান রাব্বি, যিনি পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীনম্যান-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আর মা আয়শা আক্তার কিরণ, যিনি একই সংগঠনের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন, তারা দু’জনই রুহাবের জন্মের মুহূর্ত থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, তাদের সন্তান শুধু এই পৃথিবীতে জন্ম নেবে না, বরং পৃথিবীর জন্য ইতিবাচক কিছু রেখে যাবে।
জন্ম থেকেই সবুজ বার্তা
২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রুহাবের জন্ম। শিশুর জন্মের পর সাধারণত বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন আঁকেন, কেউ ভালো ডাক্তার বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, কেউ চায় সন্তান বড় হয়ে সমাজে নাম করবে। কিন্তু ইমরান রাব্বি ও আয়শা আক্তার কিরণ ঠিক করলেন ভিন্ন কিছু করবেন।
তারা ভাবলেন, “আমাদের সন্তান পৃথিবীর অংশ, তাই তার জন্মের মুহূর্ত থেকেই পৃথিবীর প্রতি দায়িত্ববোধ শুরু হওয়া উচিত।” সেই চিন্তা থেকেই শুরু হলো ‘কার্বন-নিউট্রাল শিশু’ তৈরির যাত্রা।
কার্বন নিউট্রাল বেবি মানে কি?
“কার্বন নিউট্রাল বেবি” বলতে বোঝায় শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যত শক্তি বা সম্পদ ব্যবহৃত হয়, তার কারণে যে পরিমাণ কার্বন বাতাসে ছড়ায় তা কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, একজন মানুষ সারা জীবনে যতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে, তা প্রতিরোধ করতে প্রায় ৫০০-৬০০টি পরিপূর্ণ গাছ প্রয়োজন।
৫৮০টি গাছ লাগিয়ে শুরু হলো মিশন
রুহাবের জন্মের পর সেপ্টেম্বর মাসে তারা সাতক্ষীরার শিবপুর গ্রামে ৫৮০টি ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করেন। এর মধ্যে ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, আমড়া, সুপারি, নিমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এই গাছগুলো রুহাবের জীবন দশায় তার দ্বারা নিঃসৃত কার্বন অফসেট করতে সাহায্য করবে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, একজন মানুষ সারা জীবনে যতটুকু কার্বন নিঃসরণ করে, তা অফসেট করতে প্রায় ৫০০-৬০০টি পরিপূর্ণ গাছ প্রয়োজন। তাই রুহাবের বাবা-মা বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
ইমরান রাব্বি বলেন,
“আমরা চাই রুহাব এমন এক পরিবেশে বড় হোক যেখানে বাতাস হবে বিশুদ্ধ, চারপাশে থাকবে সবুজ। তার জন্য গাছ লাগানো মানে শুধু প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়, তার ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।”
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই অনন্য উদ্যোগ শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু গবেষণার অন্যতম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) রুহাবকে বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
‘ঢাকা প্ল্যান্টারস’ নামের একটি গ্রান্টজয়ী প্রকল্পের আয়োজিত অনুষ্ঠানে রুহাবের বাবা-মাকে সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয়। এই সার্টিফিকেটে বলা হয়েছে, রুহাবের জন্মের পর তার বাবা-মা যে পরিমাণ গাছ লাগিয়েছেন, তা তার ভবিষ্যতের কার্বন ফুটপ্রিন্ট অফসেট করতে যথেষ্ট।
একটি পরিবারের সচেতনতার গল্প
রুহাবের মা আয়শা আক্তার কিরণ বলেন,
“আমরা গাছ লাগিয়েছি শুধু রুহাবের জন্য নয়, আমাদের গ্রামের প্রতিটি শিশুর জন্য। গাছ মানে জীবন, গাছ মানে ভবিষ্যৎ। যদি প্রতিটি বাবা-মা সন্তানের জন্মের পর ১০টা গাছও লাগান, তাহলে বাংলাদেশ আরও সুন্দর, সবুজ ও নিরাপদ হবে।”
তারা আরও জানান, গাছগুলোর পরিচর্যা নিয়মিত করা হচ্ছে। গ্রামের অন্যরাও এখন অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের সন্তানদের নামে গাছ লাগাচ্ছেন।
গ্রীনম্যানের ভূমিকা
গ্রীনম্যান বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা একটি তরুণ সংগঠন। সংগঠনটির লক্ষ্য “সবুজ পৃথিবীর জন্য ছোট ছোট উদ্যোগ।” তারা বৃক্ষরোপণ, নদী রক্ষা, প্লাস্টিক দূষণ কমানোসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ইমরান রাব্বি বলেন,
“আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবেশের জন্য দায়িত্ব তৈরি হয়। যদি এই ধারণা শিশু বয়স থেকেই তৈরি করা যায়, তাহলে একদিন পৃথিবী আরও নিরাপদ হবে।”
কার্বন-নিউট্রাল মানে কী?
‘কার্বন-নিউট্রাল’ মানে হলো, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যতটুকু কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণ করে, সেই পরিমাণ কার্বনকে আবার প্রকৃতিতে শোষণ বা অফসেট করা। যেমন, গাছ লাগানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, বা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, এগুলোই কার্বন অফসেটের উপায়।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে “Net Zero” বা “Carbon Neutral” ধারণা একটি বড় আলোচ্য বিষয়। ২০৫০ সালের মধ্যে অনেক দেশ নিজেদের কার্বন নিরপেক্ষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হওয়ায়, এই উদ্যোগ দেশের জন্যও উদাহরণ হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তা
বাংলাদেশে প্রতিবছর শিল্প দূষণ, যানবাহনের ধোঁয়া, বন উজাড়, ইটভাটা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে ব্যাপক পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়। অথচ দেশে বৃক্ষ আচ্ছাদন এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে রুহাবের জন্মের পর গাছ লাগানোর এই প্রতীকী উদ্যোগ একদিকে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক নতুন অধ্যায় সূচনা করছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, রুহাবের মতো প্রতিটি শিশুর জন্ম যদি একটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অনেক সহজ হবে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
রুহাবের গ্রামের মানুষ এখন গর্বিত। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন,
“রুহাবের জন্য এত গাছ লাগানো দেখে আমরা অবাক। এখন অনেক পরিবারই বলছে, আমাদের সন্তান জন্ম নিলে আমরাও গাছ লাগাব।”
স্থানীয় প্রশাসনও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি পর্যায়েও উৎসাহিত করা হবে।
ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি
ইমরান রাব্বি ও আয়শা আক্তার কিরণ জানান, তারা চান রুহাব বড় হয়ে প্রকৃতিপ্রেমী, দায়িত্বশীল একজন মানুষ হোক। তার জন্মের সঙ্গে যুক্ত সবুজ বার্তা যেন তার জীবনের অংশ হয়ে যায়।
ইমরান বলেন,
“রুহাব হয়তো এখন কিছু বোঝে না, কিন্তু একদিন যখন বড় হবে, তখন জানতে পারবে তার জন্য গাছ লাগানো হয়েছিল। সেই জানাটা ওর মধ্যে এক গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করবে পৃথিবীর প্রতি।”
সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা
রুহাবের এই পদক্ষেপ এখন “সবুজ বিপ্লবের” সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও এই ধারণা ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে, যেন প্রতিটি নবজাতকের জন্মের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি গাছের জীবন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে ১০টি গাছ লাগালে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ নতুন গাছ জন্মাবে।” এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন রোধেই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একটি শিশুর থেকে শুরু হলো এক বিশ্বজনীন আন্দোলন
রুহাবের গল্প প্রমাণ করে, পরিবর্তন বড় কোনো সিদ্ধান্তে নয়, ছোট ছোট পদক্ষেপেই শুরু হয়। একটি পরিবারের সচেতনতা এখন পুরো জাতির অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে রুহাবের মতো আরও অনেক ছোট ছোট ‘সবুজ যোদ্ধা’ জন্ম নিক, যারা পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য, আরও সুন্দর করে তুলবে।








