দেশের বাজারে সাধারণ ক্রেতা ও জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বার্তা নিয়ে এলো বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সবশেষ সমন্বয় অনুযায়ী, দেশের বাজারে আরও এক দফা বাড়ানো হয়েছে স্বর্ণ ও রুপার দাম। বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ সোমবার (১ জুন) মূল্যবান এই ধাতু দুটি সবশেষ নির্ধারিত সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে প্রতিনিয়ত যে অস্থিরতা চলছে, তার ধারাবাহিকতায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। এর আগে গত ২৫ মে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা আজ ১ জুনও কার্যকর রয়েছে। সেদিন ভরিতে মূল্যবান এ ধাতু দুইটির দাম যথাক্রমে ২ হাজার ১৫৮ টাকা এবং ১১৭ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
কেন বাড়ল সোনা ও রুপার দাম?
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার (পিওর গোল্ড ও সিলভার) সরবরাহ এবং মূল্য দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রাখা এবং স্থানীয় বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বর্ণ ও রুপার এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৫ মে (সোমবার) সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে এবং আজ ১ জুন সোমবারও দেশের সব জুয়েলারি দোকানে এই দামেই বেচাকেনা চলছে।
ক্যারেট অনুযায়ী আজকের স্বর্ণের দামের তালিকা
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম এখন আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নিচে বিভিন্ন ক্যারেট অনুযায়ী আজকের স্বর্ণের নিখুঁত দামের তালিকা দেওয়া হলো:
- ২২ ক্যারেট স্বর্ণ: দেশের বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা।
- ২১ ক্যারেট স্বর্ণ: ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা।
- ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ আজ বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকায়।
- সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ: সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকা।
আগের দামের সাথে তুলনা: ২৩ মে কেমন ছিল সোনার বাজার?
এই দাম বাড়ার ঠিক কয়েকদিন আগেই কিন্তু দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছিল। বাজুস গত ২৩ মে সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল। সে সময় ভরিপ্রতি ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি।
এছাড়া ২৩ মে-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২৫ হাজার ২৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা কার্যকর হয়েছিল সেদিন সকাল ১০টা থেকেই। কিন্তু মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ২৫ মে আবারও দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
চলতি বছর ও গত বছরের স্বর্ণের দামের ওঠানামা
স্বর্ণের বাজারে দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৬৯ বার সমন্বয় করা হয়েছে স্বর্ণের দাম। এর মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৭ দফা, আর কমানো হয়েছে ৩২ দফা।
অন্যদিকে, গত ২০২৫ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই বছর দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং মাত্র ২৯ বার দাম কমানো হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, বাজারে স্বর্ণের দাম কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই অনেক বেশি।
রুপার দামেও বড় পরিবর্তন: এক নজরে আজকের রুপার রেট
স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বাজারে সমান্তরালভাবে বাড়ানো হয়েছে রুপার দামও। রুপার বাজারেও এখন চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বর্তমান বাজারে ক্যারেট অনুযায়ী রুপার দাম নিচে দেওয়া হলো:
- ২২ ক্যারেট রুপা: বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৭৭৪ টাকায়।
- ২১ ক্যারেট রুপা: ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৪০ টাকা।
- ১৮ ক্যারেট রুপা: ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৭২৪ টাকায়।
- সনাতন পদ্ধতির রুপা: সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা আজ বেচাকেনা হচ্ছে ৩ হাজার ৫৫৮ টাকায়।
রুপার দামের অতীত পরিসংখ্যান
চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৪০ দফা সমন্বয় করা হয়েছে রুপার দাম। যেখানে দাম ২২ দফা বাড়ানো হয়েছে আর কমানো হয়েছে বাকি ১৮ দফা। আর গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ১৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল রুপার দাম, যার মধ্যে বেড়েছিল ১০ বার এবং কমেছিল মাত্র ৩ বার।
সাধারণ ক্রেতা ও বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি
হঠাৎ করে স্বর্ণ ও রুপার দাম এতটা বেড়ে যাওয়ায় বিয়ের মৌসুম বা সাধারণ উৎসবের কেনাকাটায় বড় প্রভাব পড়ছে। ঢাকার বিভিন্ন নামী জুয়েলারি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দোকানে ক্রেতাদের ভিড় আগের চেয়ে কিছুটা কম।
সাধারণ ক্রেতারা জানাচ্ছেন, সোনার দাম এখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া মানে গহনা তৈরি করতে মজুরিসহ বিশাল অঙ্কের টাকা গুনতে হবে। তবে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা এবং স্থানীয় বাজারে খাঁটি সোনার (তেজাবি স্বর্ণ) সংকটের কারণেই বাজুস এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কবে নাগাদ শান্ত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ডলারের বাজারের ওপর ভিত্তি করে বাজুস যেকোনো সময় আবারও এই দাম সমন্বয় করতে পারে। তাই যারা নতুন করে সোনা বা রুপা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের প্রতিদিনের আপডেট বাজারের ওপর নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আজকের স্বর্ণের দামের এই সর্বশেষ রেট অনুযায়ী দেশের সব অনুমোদিত জুয়েলারি দোকানে কেনাবেচা চলছে। পরবর্তী কোনো পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এই দামই বহাল থাকবে।








