ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য ও জানাজা নামাজে অংশ নিতে তেহরানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই, ২০২৬) সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে ইরানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই রাষ্ট্রীয় সফরে স্পিকারের সাথে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলও অংশ নিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে স্পিকারের এই ইরান সফর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক জানাজা: ২ কোটি মানুষের সমাগমের আশা
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৪ জুলাই (শনিবার) তেহরানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এই জানাজাকে কেন্দ্র করে পুরো ইরানে রাষ্ট্রীয় শোক এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, আলী খামেনির শেষ জানাজায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রপ্রধানেরা এই জানাজায় শরিক হবেন। রাষ্ট্রীয় এই অনুষ্ঠান শেষে আগামী ৪ জুলাই রাতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
যেভাবে নিহত হন আলী খামেনি
ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই শীর্ষ নেতা চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলায় নিহত হন। মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর একটি যৌথ সামরিক হামলায় তিনি প্রাণ হারান। মৃত্যুকালে প্রবীণ এই নেতার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তার এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো বিশ্বের রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে।
আলী খামেনির জীবন ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন না, বরং আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিচে তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের ঐতিহ্যবাহী মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন আলী খামেনি। তরুণ বয়স থেকেই তিনি ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি তৎকালীন শাসক শাহ-এর একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে ভূমিকা
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে যে ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লব ঘটেছিল, পরিবর্তিত সেই শাসনব্যবস্থায় খামেনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিপ্রণেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিপ্লব-পরবর্তী নতুন সরকার গঠনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইরান-ইরাক যুদ্ধ
বিপ্লবের পর ১৯৮০ সালে তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপরই যখন ঐতিহাসিক ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
যুদ্ধে অসামান্য নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তার কারণে তিনি পরবর্তী সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানকে পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন।
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে উত্থান
১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। সেই সময় ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) দীর্ঘ পর্যালোচনার পর আলী খামেনিকে ইরানের পরবর্তী ‘সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা’ বা সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত করে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে খামেনির প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
আলী খামেনির মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পুরোনো ভাষণ, সাক্ষাৎকার এবং পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে তার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে চিন্তিত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই জানাজায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি ইরানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কতটা মজবুত।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরানের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আগামী ৪ জুলাই তার এই বিশাল জানাজা বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের এই বড় পরিবর্তন সম্পর্কে আপনার কী মতামত? কমেন্ট বক্সে আমাদের লিখে জানান। বিশ্বের সব তাজা ও ব্রেকিং নিউজ সবার আগে সহজ ভাষায় পড়তে আমাদের নিউজপেপার ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।








