দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য অবশেষে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়েছে। বহুল আলোচিত নবম পে স্কেলে ১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।
সচিব কমিটির সকল সদস্য এই নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করায় পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে পৌঁছেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তারা বড় ধরণের আর্থিক স্বস্তি পাবেন।
দুই ধাপে বাস্তবায়িত হবে নতুন বেতন কাঠামো
নতুন বেতন কমিশন যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছে, তাতে কোনো ঝক্কি ঝামেলা ছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে দুই ধাপে এটি বাস্তবায়নের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে:
- প্রথম ধাপ (প্রথম বছর): নতুন কাঠামোর প্রথম বছরেই সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর বা প্রদান করা হবে।
- দ্বিতীয় ধাপ (দ্বিতীয় বছর): পরবর্তী বছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সকল প্রকার ভাতা নতুন স্কেল অনুযায়ী পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
ই-বুক ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ এবং বাজেট বরাদ্দ
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক একটি বিশেষ ই-বুক প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ‘নবম পে স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ শিরোনামে এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য স্থান পেয়েছে।
ই-বুকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য সরাসরি ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধাসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বিশাল ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও এর সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন রয়েছে।
জাকির আহমেদ খান কমিশন ও সাবেক সুপারিশমালা
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ বা ১১ বছর পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠিত হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে গঠিত এই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন সরকারের কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল।
বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে জাকির আহমেদ খান কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রাথমিক প্রস্তাব করেছিল:
১. সর্বনিম্ন মূল বেতন: আগের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
২. সর্বোচ্চ মূল বেতন: স্কেলের শীর্ষ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
নাসিমুল গনি কমিটি ও প্রশাসনিক অগ্রগতির চিত্র
কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনার পর এটি বাস্তবে রূপ দিতে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিবসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও সচিবেরা ছিলেন।
সম্প্রতি এই সচিব কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করায় নতুন এই বেতন স্কেল এখন কেবল সরকারের চূড়ান্ত প্রশাসনিক আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ও আগামী দিনের সরকারি সেবা
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, বহু বছর ধরে একই বেতন কাঠামো বহাল থাকায় এবং বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সরকারি কর্মচারীদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পে স্কেলের যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল।
নবম পে স্কেল চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়ে পুরোপুরি চালু হলে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অপেক্ষার অবসান ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভালো বেতন ও কাজের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত হলে সরকারি দপ্তরগুলোতে দুর্নীতি কমবে এবং সাধারণ জনগণ দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাবেন।








