চারপাশে যখন রাজনীতি আর ক্রিকেটের জটিল সমীকরণের ঝড় বইছে, তখন তিনি শান্ত। যেন এক ধ্যানমগ্ন ঋষি। বল হাতে দৌড় শুরু করলেই পৃথিবীটা তার কাছে ছোট হয়ে আসে ২২ গজে। কাটার, স্লোয়ার, বাউন্সার আর ইয়র্কারের পসরা সাজিয়ে তিনি ব্যস্ত ব্যাটসম্যানদের বোকা বানাতে। কথা হচ্ছে বাংলাদেশের পেস সেনসেশন মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে।
ভেনেজুয়েলা বা কলম্বিয়ার মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তাপের খবর যখন বিশ্বমঞ্চে, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেট পাড়ায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে মুস্তাফিজের আইপিএল (IPL) ইস্যু। কিন্তু এসবের কোনো কিছুকেই পাত্তা না দিয়ে বিপিএলের মাঠে নিজের জাত চিনিয়ে যাচ্ছেন ‘দ্য ফিজ’। রোববার ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে রংপুর রাইডার্সের অবিশ্বাস্য জয়ে নায়ক হয়ে উঠলেন তিনিই।
শেষ মুহূর্তের স্নায়ুচাপ ও মুস্তাফিজের জাদু
রোববার বিপিএলের হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল রংপুর রাইডার্স ও ঢাকা ক্যাপিটালস। ম্যাচটি যখন শেষ পর্যায়ে, তখন জয়ের পাল্লা ঢাকার দিকেই ঝুঁকে ছিল। শেষ ১৮ বলে ঢাকার প্রয়োজন ছিল মাত্র ২৫ রান। হাতে তখনও ৭টি উইকেট। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের এই যুগে ১৮ বলে ২৫ রান এবং হাতে ৭ উইকেট এটাকে নিতান্তই সহজ সমীকরণ বলা চলে। গ্যালারিতে থাকা ঢাকার সমর্থকরা হয়তো জয়ের উৎসবের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
কিন্তু প্রতিপক্ষ দলে যখন মুস্তাফিজুর রহমানের মতো একজন বোলার থাকেন, তখন ‘সহজ’ শব্দটি আর সহজ থাকে না। ঢাকার ব্যাটসম্যানরা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ডেথ ওভারের অন্যতম সেরা এই কারিগর।
ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া সেই ১৮তম ওভার
খেলার মোড় ঘুরে যায় ইনিংসের ১৮তম ওভারে। রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান বল তুলে দেন মুস্তাফিজের হাতে। ওই মুহূর্তে ব্যাটসম্যানদের ওপর চড়াও হওয়ার বদলে মুস্তাফিজ দেখালেন তার জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ।
পুরো ওভারে তিনি খরচ করলেন মাত্র ২ রান! শুধু রান আটকে রেখেই ক্ষান্ত হননি, ওভারের শেষ বলে ফিরিয়ে দিলেন ঢাকার অন্যতম বিপজ্জনক ব্যাটার শামীম হোসেনকে। এই একটি ওভারই ম্যাচের রং বদলে দেয়। যে ঢাকা জয়ের স্বপ্ন দেখছিল, হঠাৎ করেই তারা চাপে পড়ে যায়।
শেষ ওভারের নাটকীয়তা ও বিজয়ের হাসি
১৮তম ওভারে মুস্তাফিজের কৃপণ বোলিংয়ের পর ১৯তম ওভারে বল করতে আসেন রংপুরের পাকিস্তানি পেসার আকিফ জাভেদ। কিন্তু আকিফ সেই চাপ ধরে রাখতে পারেননি। তার ওভারে ঢাকা ১৩ রান তুলে নেয়। সাব্বির রহমান একটি চার ও একটি ছক্কা মেরে ঢাকাকে আবারও জয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসেন।
শেষ ওভারে জয়ের জন্য ঢাকার প্রয়োজন ছিল ১০ রান। ক্রিজে ছিলেন সেট ব্যাটার মোহাম্মদ মিঠুন (যিনি ফিফটি করে অপরাজিত ছিলেন) এবং হার্ড-হিটার সাব্বির রহমান। টি-টোয়েন্টিতে শেষ ওভারে ১০ রান খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু বোলিং প্রান্তে আবারও সেই মুস্তাফিজ।
মুস্তাফিজের অভিজ্ঞতার কাছে হার মানল ঢাকার আগ্রাসন। শেষ ওভারের ৬টি বল তিনি করলেন নিখুঁত নিশানায়। কোনো বাউন্ডারি বা ওভার-বাউন্ডারি তো দূরে থাক, ব্যাটসম্যানরা বড় শট খেলতেই পারলেন না। পুরো ওভারে মুস্তাফিজ দিলেন মাত্র ৪টি সিঙ্গেল। এমনকি দুটি বল থেকে কোনো রানই নিতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা।
ফলাফল নিশ্চিত হারের মুখ থেকে ৫ রানের অবিশ্বাস্য এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রংপুর রাইডার্স। নিজের শেষ দুই ওভারে (১৮তম ও ২০তম) মুস্তাফিজ দিয়েছেন মাত্র ৬ রান! যেখানে অন্য বোলাররা মার খাচ্ছিলেন, সেখানে মুস্তাফিজ ছিলেন এক কথায় অনবদ্য।
অধিনায়ক সোহানের চোখে ‘বিন্দাস’ মুস্তাফিজ
ম্যাচ শেষে রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহানের মুখে ছিল চওড়া হাসি। ১৯তম ওভারে আকিফ জাভেদ যখন ছক্কা হজম করেছিলেন, তখন সোহানকে বেশ বিরক্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু মুস্তাফিজের শেষ ওভারের পর সেই বিরক্তি উবে গিয়ে ফুটে ওঠে স্বস্তি।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মুস্তাফিজের প্রশংসা করতে গিয়ে সোহান বলেন, “অবশ্যই দেখুন, মুস্তাফিজ বিশ্বমানের বোলার। সেটা ও অনেকদিন ধরে প্রমাণ করে আসছে এবং ওই বিশ্বাসটা সবার আছে ওর উপরে। অবশ্যই আমার কাছে মনে হয় যে, ওকে নিয়ে বলার কিছু নাই। ও সবসময় মুগ্ধ করে।”
মুস্তাফিজের এই পারফরম্যান্স এমন এক সময়ে এলো, যখন তাকে নিয়ে মাঠের বাইরে চলছে তুমুল আলোচনা।
আইপিএল ইস্যু: হতাশা নাকি জেদ?
মুস্তাফিজুর রহমানের জন্য এবারের আইপিএল (IPL) ছিল বিশেষ কিছু। নিলামে তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে তাকে দলে ভিড়িয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR)। বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের জন্য এটি ছিল রেকর্ড মূল্য। প্রথমবারের মতো কলকাতার হয়ে খেলার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছিল তাকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মুস্তাফিজের আইপিএল খেলা আটকে যায়। এত বড় অঙ্কের টাকা এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলার সুযোগ হাতছাড়া হওয়া যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই মানসিকভাবে বড় ধাক্কা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই ঘটনার প্রভাব হয়তো মুস্তাফিজের খেলায় পড়বে। তিনি হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন।
কিন্তু বিপিএলের মাঠে যা দেখা গেল, তা সম্পূর্ণ উল্টো। মুস্তাফিজ যেন আরও বেশি শানিত, আরও বেশি একাগ্র। তার পারফরম্যান্সই বলে দিচ্ছে, বাইরের ঝড় তার মনের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
কেমন আছেন মুস্তাফিজ?
আইপিএল থেকে বাদ পড়া, ৯ কোটির হাতছানি উপেক্ষা করা সব মিলিয়ে মুস্তাফিজের মনের অবস্থা কী? তিনি কি হতাশ? নাকি ক্ষুব্ধ?
অধিনায়ক সোহান জানালেন ভেতরের খবর। তিনি বলেন, মুস্তাফিজ বরাবরই নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। খুব বেশি উচ্ছ্বাস বা খুব বেশি হতাশা কোনোটাই তাকে স্পর্শ করে না।
সোহান বলেন, “অবশ্যই ও (মোস্তাফিজ) বিন্দাস আছে। তবে পাশাপাশি আমার মনে হয়, খারাপ লাগা তো থাকতেই পারে। কারণ ও যেটা ডিজার্ভ করে। আমার মনে হয়, যে আগেও আরও বেশি ডিজার্ভ করত। অবশ্যই ওই জায়গা থেকে থাকতে পারে (খারাপ লাগা) তবে আমার মনে হয় যে, ইট’স ফাইন।”
সোহানের কথায় স্পষ্ট, মুস্তাফিজ হয়তো মনে মনে কিছুটা ব্যথিত, কিন্তু পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে তিনি সেই ব্যথাকে পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে দেননি।
সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় ও মুস্তাফিজের নির্লিপ্ততা
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রতিবাদের ঝড়। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) আইসিসিকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে অংশ নেবে না। দুই দেশের ক্রিকেটীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন বেশ উত্তপ্ত।
এত সব ঘটনা কি মুস্তাফিজকে বিচলিত করে না? এই প্রশ্নের জবাবে সোহান বলেন, মুস্তাফিজ এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না।
সোহান জানান, “সত্যি কথা বলতে সোশ্যাল মিডিয়া বা এগুলা খুব একটা অনুসরণ করি না। বাইরে কী হচ্ছে আমি খুব একটা বেশি জানি না। হ্যাঁ, দলের ভেতরে আমাদের কথা হচ্ছিল। তবে যেটা বললাম, মোস্তাফিজের অবশ্যই খারাপ লাগা থাকতে পারে, সে ডিজার্ভ করতে পারে। তবে আমার মনে হয় যে, ও সবসময় স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশের হয়ে সেরাটা দেওয়ার এবং আমার কাছে মনে হয়, ও বিন্দাস আছে।”
মুস্তাফিজুর রহমান প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু একজন বোলার নন, তিনি একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। ৯ কোটি টাকার আইপিএল চুক্তি বাতিল বা রাজনৈতিক টানাপোড়েন কোনো কিছুই তার ফোকাস নড়াতে পারেনি। বল হাতে ২২ গজে তিনি কথা বলেন, আর সেই কথার জবার দিতে ব্যর্থ হয় বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরা।
রংপুর রাইডার্সের এই জয় এবং মুস্তাফিজের এই ‘বিন্দাস’ মনোভাব বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক বড় স্বস্তির খবর। বাইরের দুনিয়ায় যাই ঘটুক না কেন, কাটার মাস্টার আছেন তার চেনা ছন্দে, আর সেটাই ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের।








