হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়দেশে পরপর দুইবার ভূমিকম্প: ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশকের সতর্কতা
spot_img

দেশে পরপর দুইবার ভূমিকম্প: ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশকের সতর্কতা

গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কেঁপে উঠল মাটি। সোমবার (৫ জানুয়ারি) ভোররাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সিলেটসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের মধ্যে। একবার নয়, পরপর দুইবার শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে মাঝারি মানের এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসাম রাজ্যে। তবে এর প্রভাব ভালোভাবেই টের পেয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো।

ভূমিকম্পের পরপরই কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আফটারশক বা ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছেন। চলুন জেনে নিই এই ভূমিকম্পের বিস্তারিত তথ্য এবং আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আমাদের কেন সতর্ক থাকতে হবে।

ভোররাতে ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুইবার কম্পন

সোমবার ভোর ৪টা ৪৭ মিনিট। বেশিরভাগ মানুষ তখন গভীর ঘুমে। ঠিক সেই সময়েই প্রথম ধাক্কাটি অনুভূত হয়। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয় ভোর ৪টা ৪৭ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে। আতঙ্কে মানুষ বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই ঠিক ৩০ সেকেন্ডের মাথায়, অর্থাৎ ৪টা ৪৭ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে দ্বিতীয়বার কেঁপে ওঠে সবকিছু।

সিলেটের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে ঘরের আসবাবপত্র নড়তে শুরু করে। বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভয়ে নিচে নেমে রাস্তায় চলে আসেন। তবে ভোরের দিকে হওয়ায় রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি কম ছিল, ফলে বড় ধরনের কোনো হট্টগোল হয়নি।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও মাত্রা

ভূমিকম্পটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ। আমেরিকান ভূতাত্ত্বিক অধিদপ্তর (USGS) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে তিনি জানান, এই কম্পনগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটির নিকটবর্তী মরিগাঁও এলাকায়।

  • প্রথম ভূমিকম্প: মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২।
  • দ্বিতীয় ভূমিকম্প: মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪।
  • গভীরতা: এই ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার গভীরে।

ভূপৃষ্ঠের ৩৫ কিলোমিটার গভীর থেকে উৎপন্ন হওয়ায় এর কম্পন বেশ বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম রাজ্য ছাড়াও মেঘালয় এবং ত্রিপুরার কিছু অংশেও এই কম্পন টের পাওয়া গেছে।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশকের আশঙ্কা

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি বা ‘আফটারশক’। গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ তার ফেসবুক পোস্টে এই বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে একটি মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়। ভূতাত্ত্বিক নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের কম্পনের পর ফল্ট লাইনগুলো বা মাটির নিচের ফাটলগুলো পুনরায় বিন্যস্ত হতে থাকে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশক হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।”

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অথবা দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের যেকোনো সক্রিয় ফল্ট লাইনে এই আফটারশক অনুভূত হতে পারে। আফটারশকের মাত্রা মূল ভূমিকম্পের চেয়ে সাধারণত কম হয়, তবে দুর্বল কাঠামোর ভবন বা ইতিমধ্যে ফাটল ধরা ভবনের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে।

সিলেট কেন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে?

সিলেট অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে ‘ডাউকি ফল্ট’ (Dauki Fault) লাইনের খুব কাছে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই ফল্ট লাইনটি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত সক্রিয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় আমরা বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি।

বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো ‘সিসমিক জোন’ বা ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মধ্যে রেড জোনে পড়ে। সোমবারের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, মাটির নিচের এই প্লেটগুলো অস্থির অবস্থায় রয়েছে।

এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির খবর

স্বস্তির বিষয় হলো, সোমবার ভোরের এই জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোথাও কোনো ভবন ধসে পড়া বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ভূমিকম্পের তীব্রতায় কিছু পুরনো ভবনে ফাটল ধরার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসন সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আফটারশক বা ভূমিকম্পের সময় করণীয় আপনার

যেহেতু বিশেষজ্ঞরা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আফটারশকের আশঙ্কা করছেন, তাই আমাদের সবারই কিছু প্রস্তুতি এবং সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, তাই সচেতনতাই বাঁচার একমাত্র উপায়।

ঘরের ভেতরে থাকলে

  • মাথা ঠান্ডা রাখুন: ভূমিকম্প শুরু হলে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করবেন না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
  • ড্রপ, কাভার, হোল্ড অন: কম্পন শুরু হলে সাথে সাথে মেঝতে বসে পড়ুন (Drop)। কোনো শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন (Cover)। টেবিলের পায়া শক্ত করে ধরে রাখুন (Hold on) যতক্ষণ না কম্পন থামে।
  • কাঁচ থেকে দূরে: জানালা, কাঁচের দরজা, আয়না বা আলমারি যা আপনার ওপর পড়তে পারে, তা থেকে দূরে থাকুন।
  • বালিশ ব্যবহার: যদি আপনি বিছানায় থাকেন এবং ওঠার সময় না পান, তবে বালিশ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন।

বহুতল ভবনে থাকলে

  • লিফট ব্যবহার করবেন না: ভূমিকম্পের সময় বা পরপরই কখনোই লিফট ব্যবহার করবেন না। বিদ্যুৎ চলে গেলে বা লিফট ছিঁড়ে গেলে বড় বিপদ হতে পারে।
  • সিঁড়ি ব্যবহার: নামার জন্য সবসময় সিঁড়ি ব্যবহার করুন। তবে কম্পন চলাকালীন সিঁড়িতে দৌড়াদৌড়ি করবেন না।
  • বারান্দা পরিহার: বারান্দা বা ছাদের কিনারা থেকে দূরে থাকুন।

বাইরে থাকলে

  • খোলা জায়গা: বড় গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, এবং উঁচু ভবন থেকে দূরে খোলা কোনো জায়গায় সরে যান।
  • গাড়িতে থাকলে: গাড়িটি নিরাপদ স্থানে (গাছ বা পোল নেই এমন জায়গায়) থামিয়ে ভেতরেই অবস্থান করুন।

জরুরি প্রস্তুতি (ইমার্জেন্সি ব্যাগ)

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবারেরই একটি ইমার্জেন্সি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা উচিত। এতে যা যা থাকা জরুরি:

  • শুকনো খাবার (চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট)।
  • পানি।
  • টর্চলাইট ও অতিরিক্ত ব্যাটারি।
  • ফার্স্ট এইড বক্স (জরুরি ওষুধ, ব্যান্ডেজ)।
  • গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র (জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির দলিল ইত্যাদির ফটোকপি পলিথিনে মোড়ানো)।
  • নগদ কিছু টাকা।

প্রকৃতির এই দুর্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি এবং সচেতনতা আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। সোমবারের ভূমিকম্পটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে সিলেট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের আগামী কয়েকদিন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলি মেনে চলুন এবং গুজব থেকে দূরে থাকুন।

ভূমিকম্প বা আফটারশক অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!