খেলাধুলার জগতে একটি কথা বেশ প্রচলিত “রেকর্ড তৈরিই হয় ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ার জন্য।” ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুতেই যা ঘটল, তা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে কোচদের বয়সসংক্রান্ত একটি বিশেষ রেকর্ড একে একে তিনবার ভেঙেছে!
শেষ পর্যন্ত সব আলোচনা চুরমার করে দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখেছেন কুরাসাওয়ের প্রধান কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে সিংহাসনে বসেছেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে চার দিনের মধ্যে বারবার ওলটপালট হলো বিশ্বকাপের এই অনন্য রেকর্ড।
১. ওত্তো রেহাগেলের ১৬ বছরের রেকর্ড যেভাবে ভাঙল
ফুটবল বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে ম্যাচ পরিচালনার রেকর্ডটি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ছিল গ্রিসের সাবেক কোচ ওত্তো রেহাগেলের দখলে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে তিনি যখন গ্রিস দলকে নেতৃত্ব দেন, তখন তার বয়স ছিল ৭১ বছর। তারও আগে ২০০২ বিশ্বকাপে ৭০ বছর বয়সে প্যারাগুয়ের কোচ হিসেবে এই রেকর্ড নিজের করে রেখেছিলেন সিজার মালদিনি।
দীর্ঘদিন ধরে অক্ষত থাকা ওত্তো রেহাগেলের এই রেকর্ডটি ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মুখ থুবড়ে পড়ে।
২. চার দিনে তিন কোচের রেকর্ড ভাঙার নাটকীয়তা
এবারের বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল কোচদের বয়সের রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক রোমাঞ্চকর খেলা। মাত্র চার দিনের মধ্যে যেভাবে এই রেকর্ড হাতবদল হলো:
- প্রথম ধাক্কা (হুগো ব্রুস): মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ কোচ হুগো ব্রুস ৭৪ বছর বয়সে ওত্তো রেহাগেলের রেকর্ডটি ভেঙে প্রথম নতুন ইতিহাস গড়েন।
- দ্বিতীয় ধাক্কা (মিরোস্লাভ কুবেক): হুগো ব্রুসের সেই রেকর্ডটি টিকতে পারেনি ২৪ ঘণ্টাও! মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই চেকিয়ার কোচ মিরোস্লাভ কুবেক প্রায় ৭৫ বছর বয়সে মাঠে নেমে ব্রুসের রেকর্ডটি নিজের নামে লিখে নেন।
- চূড়ান্ত ইতিহাস (ডিক অ্যাডভোকাট): এই রেকর্ড ভাঙার খেলা এখানেই শেষ হয়নি। রোববার জার্মানির বিপক্ষে কুরাসাওয়ের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট যখন ডাগআউটে দাঁড়ান, তখন তার বয়স ৭৮ বছর! এর মাধ্যমে তিনি বাকি সবাইকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে নেন।
৩. ডিক অ্যাডভোকাটের ফিরে আসা এবং কুরাসাওয়ের রূপকথা
২০২৪ সালে যখন ডিক অ্যাডভোকাট কুরাসাওয়ের কোচের দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই দলটির ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। তার দুর্দান্ত কোচিংয়েই ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে কুরাসাও।
তবে এই রেকর্ড গড়ার পথটি অ্যাডভোকাটের জন্য সহজ ছিল না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার মেয়ের হঠাৎ গুরুতর অসুস্থতার কারণে তিনি কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সহকারী কোচ ফ্রেড রুটেন দলের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে মেয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়রা তাদের প্রিয় কোচকে ফিরে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানায়। খেলোয়াড়দের ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে মে মাসে তিনি আবারও দলের প্রধান কোচের দায়িত্বে যোগ দেন এবং বিশ্বকাপে এই ঐতিহাসিক রেকর্ডটি গড়েন।
৪. চার দশকের এক কিংবদন্তি ক্যারিয়ার
ডিক অ্যাডভোকাট বিশ্ব ফুটবলের কোনো সাধারণ নাম নন। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ফুটবল কোচিং পেশার সাথে যুক্ত আছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি তিন দফায় তার নিজের দেশ নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন নামী ক্লাব ছাড়াও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অভিজ্ঞতা বিশাল। তিনি বিশ্বের মোট আটটি দেশের জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার এক বিরল কীর্তি গড়েছেন। দেশগুলো হলো:
১. নেদারল্যান্ডস
২. সংযুক্ত আরব আমিরাত
৩. দক্ষিণ কোরিয়া
৪. বেলজিয়াম
৫. রাশিয়া
৬. সার্বিয়া
৭. ইরাক
৮. কুরাসাও
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল প্রেমীদের যেমন দারুণ সব ম্যাচের উপহার দিচ্ছে, তেমনি মাঠের বাইরের এমন চমৎকার সব পরিসংখ্যান ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। ৭৮ বছর বয়সেও ফুটবলের প্রতি ডিক অ্যাডভোকাটের এই ভালোবাসা এবং কুরাসাওকে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে আসার গল্প ফুটবল বিশ্বে চিরদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। চার দিনে তিনবার রেকর্ড ভাঙার এই রোমাঞ্চকর ঘটনা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হয়ে রইল।








