এবার শীত কেমন হবে ২০২৫ – ২৬ সালের সবার মনে এই একটাই প্রশ্ন। শীতকাল বাংলাদেশের অন্যতম প্রিয় মৌসুম। হেমন্তের শেষে উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল হাওয়ার স্পর্শে শুরু হওয়া এই ঋতুটি চলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। বাংলাদেশে শীতকাল ২০২৫-২৬ সালের শীতের পূর্বাভাস এখনও প্রকাশিত না হলেও, গত কয়েক বছরের জলবায়ুগত প্রবণতা বিশ্লেষণ করে একটি ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, শীতের সময়কাল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও, তীব্রতা থাকবে গতানুগতিক, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে। এবার শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা এবং ঘন কুয়াশার আধিক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
এবারের বাংলাদেশে শীত কেমন পড়বে সামগ্রিক পূর্বাভাস
জলবায়ু মডেল এবং বিগত বছরের প্রবণতা অনুসারে, ২০২৫-২৬ সালের এ বছর শীত কেমন পড়বে তার সম্ভাব্য চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- আবহাওয়া অধিদপ্তরের মৌসুমি পূর্বাভাস (সম্ভাব্য): দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর ডিসেম্বরের শেষার্ধ এবং জানুয়ারি মাসে ১ থেকে ২ টি মাঝারি (৬°C-৮°C) এবং ২ থেকে ৩ টি তীব্র (৪°C-৬°C) শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।
- শীতের শুরু কবে হতে পারে: সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে রাতের তাপমাত্রা কমতে শুরু করে এবং নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শীতের আনুষ্ঠানিক শুরু হবে।
- শীতের সম্ভাব্য সময়কাল: তীব্র শীতের সময়কাল হবে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, যা মূলত জানুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে থাকবে। সামগ্রিক শীত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
- গড় তাপমাত্রা কত থাকবে: সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে শীতের আবহাওয়া দিনের গড় তাপমাত্রা ২২°C থেকে ২৭°C এর মধ্যে এবং রাতের সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১২°C থেকে ১৬°C এর মধ্যে থাকতে পারে।
- হালকা বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা: পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে ডিসেম্বর বা জানুয়ারির শুরুতে দেশের দু-এক জায়গায় হালকা বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। তবে, বিশেষ করে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশার আধিক্য থাকবে।
অঞ্চলভেদে বাংলাদেশের শীতের তীব্রতা | winter temperature in bangladesh
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা ভিন্ন হয়। বাংলাদেশে শীতের তাপমাত্রা:
উত্তরাঞ্চল (রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও)
- সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কত হতে পারে: দেশের এই অঞ্চলে শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকবে। জানুয়ারি মাসে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬°C থেকে ৮°C এর নিচে নেমে যেতে পারে।
- সম্ভাব্য শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা: কমপক্ষে ২ থেকে ৩টি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আঘাত হানতে পারে, যার সময়কাল ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
- কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব: তীব্র শীতের কারণে সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। কৃষি জমিতে বরফতুল্য শিশির পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা আলুর চারা ও অন্যান্য রবি ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মধ্যাঞ্চল (ঢাকা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ)
- মাঝারি শীতের সম্ভাবনা: এই অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা উত্তরাঞ্চলের চেয়ে কম হলেও মাঝারি শীত ৯°C থেকে ১২°C অনুভূত হবে।
- সকালের কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের প্রভাব: ভোরে ও সকালে ঘন কুয়াশার কারণে শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চল (বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম)
- তুলনামূলক কম শীত: সমুদ্রের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সামান্য বেশি থাকবে। শীত ১২°C থেকে ১৫°C অনুভূত হবে।
- উপকূলীয় অঞ্চলে কুয়াশা ও শিশিরপাত: এই অঞ্চলে আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে ভোরে কুয়াশা ও ভারী শিশিরপাত লক্ষ্য করা যাবে।
এবারের শীতের তাপমাত্রা পূর্বাভাস
মাসভিত্তিক তাপমাত্রার প্রবণতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে শীতের প্রকৃতি বোঝা যায়। বাংলাদেশে শীতের পূর্বাভাস ২০২৫:
- ডিসেম্বর মাসে সম্ভাব্য তাপমাত্রা: এই মাসে শীত ধীরে ধীরে বাড়বে। রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২°C থেকে ১৮°C এর মধ্যে থাকবে। মাসের শেষদিকে প্রথম মৃদু শৈত্যপ্রবাহ আসার সম্ভাবনা থাকে।
- জানুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা: এটি হবে শীতের সর্বোচ্চ তীব্রতার মাস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেশিরভাগ অঞ্চলে ১০°C এর নিচে নামবে, উত্তরাঞ্চলে তা ৬°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
- ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা: ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। মাসের মাঝামাঝি সময়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫°C ছাড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শীতের বিদায় ঘণ্টা বাজবে।
- গত কয়েক বছরের তুলনামূলক বিশ্লেষণ: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতের আগমন দেরি হচ্ছে এবং শীতকাল সংক্ষিপ্ত হচ্ছে। তবে যখন শৈত্যপ্রবাহ আসে, তখন তা তীব্রভাবেই আসে। এই বছরও একই প্রবণতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।
কুয়াশা, শিশিরপাত ও বৃষ্টির সম্ভাবনা
শীতের সময় কুয়াশা ও আর্দ্রতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:
- ঘন কুয়াশার সময়কাল ও প্রভাব: ডিসেম্বর মাসের শেষভাগ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত কুয়াশা সবচেয়ে ঘন হবে। বিশেষ করে নদী অববাহিকা এবং গ্রামীণ এলাকায় দিনের বেলায়ও কুয়াশার প্রভাব থাকতে পারে, যা সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাবে।
- শিশিরপাতের পরিমাণ: রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে বিশেষত উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ফসলি জমিতে ভারী শিশিরপাত হতে পারে, যা ফসলের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- হালকা বৃষ্টি বা মেঘাচ্ছন্ন দিনের সম্ভাবনা: পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বা জানুয়ারির শুরুতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলে এক বা দু’দিনের জন্য অপ্রত্যাশিত হালকা বৃষ্টি বা মেঘাচ্ছন্ন দিন দেখা যেতে পারে।
শীতকালীন আবহাওয়ার প্রভাব
কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব
- শাকসবজি ও ধান উৎপাদনে শীতের প্রভাব: শুষ্ক ও শীতল আবহাওয়া শীতকালীন শাকসবজি (ফুলকপি, বাঁধাকপি) এবং রবি শস্য (গম, সরিষা, আলু) উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। তবে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও ভারী শিশিরপাত আলুর ‘লেট ব্লাইট’ রোগসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- কৃষকদের জন্য পরামর্শ: শৈত্যপ্রবাহের সময় ফসলের জমিতে হালকা সেচ দেওয়া, চারা ঢেকে রাখা এবং ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে বীজতলা প্রস্তুত রাখা জরুরি।
দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্য
- ঠান্ডাজনিত রোগবালাই (সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া): শীতকালে সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ব্রঙ্কাইটিস এবং শিশুদের নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে। বায়ুদূষণ এবং কুয়াশা মিশ্রিত দূষণ স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ায়।
- স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়: পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরিধান করা, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ রাখা, গরম পানীয় পান করা এবং ঠাণ্ডা বাতাস এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাগুলো বেড়ে যাওয়ায় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার।
জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতের প্রকৃতি
- গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে শীতের সময়কাল কমে আসা: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাংলাদেশে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব কমে আসছে। এখনকার শীতকাল মাত্র আড়াই মাস স্থায়ী হয়, যা আগে তিন মাসেরও বেশি ছিল।
- গত কয়েক বছরের প্রবণতা: গত কয়েকটি শীতকালে লক্ষ্য করা গেছে যে, শীত দেরিতে শুরু হলেও যখন শৈত্যপ্রবাহ আসে, তা হঠাৎ করেই আসে এবং তীব্রতা খুব বেশি থাকে।
- ভবিষ্যতে শীতের ধরণ কেমন হতে পারে: ভবিষ্যতে শীতের সময়কাল আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারে, তবে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
সম্ভাব্য সময়সূচি – কখন শুরু ও শেষ হবে শীত
নিম্নলিখিত সারণিটি ২০২৫-২৬ সালের এই বছর শীত কেমন পড়বে একটি সম্ভাব্য সময়সূচি উপস্থাপন করে:
| সময়কাল | আবহাওয়ার ধরণ | রাতের সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা |
| নভেম্বর শেষ | হালকা শীতের শুরু, ফ্যান বন্ধ | ১৮°সে – ২২°সে |
| ডিসেম্বর | মাঝারি শীত, সকালে কুয়াশা, গরম কাপড়ের ব্যবহার শুরু | ১২°সে – ১৮°সে |
| জানুয়ারি | তীব্র শীত, একাধিক শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা, ঘন কুয়াশা | ৮°সে – ১৪°সে (উত্তরাঞ্চলে ৬°সে এর নিচে) |
| ফেব্রুয়ারি | শীতের বিদায়, দিনের বেলা উষ্ণতা বৃদ্ধি, গরম কাপড়ের ব্যবহার কমে আসা | ১৫°সে – ২০°সে |
বিশেষজ্ঞ মতামত ও আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য
- আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ রিপোর্ট (প্রত্যাশিত): বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে সাধারণত বলা হয় যে, এ বছর স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।
- জলবায়ু গবেষকদের বিশ্লেষণ: জলবায়ু গবেষকরা মনে করেন, উত্তর দিক থেকে আসা বাতাস এবং স্থানীয় আর্দ্রতার মিশ্রণ এই শীতের তীব্রতা নির্ধারণ করবে। এল নিনো/লা নিনার মতো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি শীতের সামগ্রিক প্রকৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫-২৬ সালের বাংলাদেশের শীতকাল এর উষ্ণায়নের প্রভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও তীব্রতাযুক্ত হতে পারে। উত্তরাঞ্চলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দেশজুড়ে কুয়াশার কারণে পরিবহন ও জনজীবনে সতর্কতা প্রয়োজন। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।








