হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Saturday, August 8, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়বগুড়ায় ২ টাকা কেজির ফুলকপি ঢাকায় ৪০: মহাস্থানগড় হাটে কৃষকের কান্না
spot_img

বগুড়ায় ২ টাকা কেজির ফুলকপি ঢাকায় ৪০: মহাস্থানগড় হাটে কৃষকের কান্না

শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে বগুড়ার মহাসড়ক দিয়ে একের পর এক ট্রাক ছুটে চলে ঢাকার উদ্দেশ্যে। এই ট্রাকগুলো বোঝাই থাকে কৃষকের ঘাম ঝরানো টাটকা সবজিতে। অথচ, উৎপত্তিস্থল বগুড়ার মহাস্থানগড় হাটে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পানির দরে সবজি বিক্রি করতে গিয়ে চোখের পানি ফেলছেন কৃষকরা। বিশেষ করে ফুলকপির বাজার দর এতটাই নিচে নেমেছে যে, এক কেজি ফুলকপির দাম এখন একটি লজেন্সের চেয়েও কম।

উত্তরের শস্যভান্ডার খ্যাত বগুড়ায় এখন সবজির ভরা মৌসুম। কিন্তু এই বাম্পার ফলনই যেন কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ফুলকপি ২ টাকায় বিক্রি হলেও, ঢাকার বাজারে সেই একই ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার মধ্যে এই বিশাল দামের ফারাক এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে প্রকৃত কৃষকরা আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে।

অবিশ্বাস্য দরপতন: ৮০ টাকা মণ ফুলকপি

বগুড়া জেলার সর্ববৃহৎ শাকসবজির পাইকারি বাজার মহাস্থানগড় হাট। ভোর না হতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্যান, ভটভটি ও পিকআপে করে সবজি নিয়ে হাটে ভিড় জমান চাষিরা। গত দুই সপ্তাহ আগেও যে বাজারের চিত্র ছিল আশাব্যঞ্জক, তা এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে।

সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায় এক অবিশ্বাস্য চিত্র। মাত্র ১৪ দিন আগেও যে ফুলকপি প্রতি মণ (৪০ কেজি) বিক্রি হয়েছে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকায়, আজ তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি ফুলকপির পাইকারি দাম পড়ছে ২ টাকা থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা।

শিবগঞ্জ থেকে আসা কৃষক মো. আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বলেন, “ভাই, দুই সপ্তাহ আগে ১,২০০ টাকা মণ দরে কপি বেচেছি। আর আজ সেই কপি ৮০ টাকায়ও কেউ নিতে চাচ্ছে না। সার, ওষুধ আর কামলা (শ্রমিক) খরচ তো দূরের কথা, ভ্যান ভাড়াই তো উঠছে না।”

ঢাকা বনাম বগুড়া: দামের আকাশ-পাতাল ব্যবধান

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্বের সাথে সাথে দামের পার্থক্য। বগুড়ার হাটে যেই ফুলকপি ২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ঢাকার কাঁচাবাজারে সেই কপিই বিক্রি হচ্ছে পিস প্রতি ৩০, ৪০ বা কোনো কোনো অভিজাত এলাকায় ৫০ টাকায়।

একটি ফুলকপি বগুড়া থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে কেজিতে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ টাকা বাড়ার কথা। কিন্তু ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা ১০ গুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা লোভের কারণেই কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, আবার সাধারণ ভোক্তারাও চড়া দামে সবজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যান্য সবজির বাজার পরিস্থিতি

শুধু ফুলকপি নয়, বাজারের অন্যান্য সবজির অবস্থাও শোচনীয়। নিচে মহাস্থান হাটের বর্তমান বাজার দরের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

  • মুলা: প্রতি মণ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা (কেজি প্রতি ৮-১০ টাকা)।
  • বাঁধাকপি: প্রতিটি ৫ থেকে ১০ টাকা।
  • শিম: কেজি প্রতি ১৫ টাকা।
  • করলা: কেজি প্রতি ৩৫ টাকা।
  • কাঁচা মরিচ: কেজি প্রতি ৩০ টাকা।
  • পাকা টমেটো: কেজি প্রতি ৬০ টাকা।
  • নতুন আলু: কেজি প্রতি ১২ থেকে ২৫ টাকা (জাতভেদে)।
  • পেঁয়াজ: কেজি প্রতি ৬০ টাকা।

তবে এর মাঝে কিছুটা ব্যতিক্রম বেগুন। বাজারে বেগুনের চাহিদা থাকায় তা প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজি প্রতি ১৫-২০ টাকা।

আলুর বাজারেও ধস: হিমাগারে জমে আছে পুরনো আলু

বগুড়া অঞ্চল আলুর জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এবার আলুর বাজারেও চলছে মন্দা। গত সপ্তাহের তুলনায় নতুন আলুর দাম কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে নতুন আলু জাতভেদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে, হিমাগারগুলোতে (Cold Storage) এখনো বিপুল পরিমাণ পুরনো আলু মজুদ রয়েছে। বাজারে দাম না থাকায় কৃষকরা হিমাগার থেকে তাদের আলু তুলছেন না। হিমাগার কর্তৃপক্ষ মাইকিং করেও কৃষকদের সাড়া পাচ্ছেন না। কারণ, হিমাগারের ভাড়া পরিশোধ করে বর্তমান বাজার দরে আলু বিক্রি করলে কৃষকের লোকসান হবে। ফলে পুরনো আলুর ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

কৃষকের হাহাকার: খরচ তোলাই দায়

বগুড়ার গাবতলী থেকে আসা কৃষক আজাদ আলী বলেন, “এক বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করতে আমাদের খরচ হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখন যে দাম, তাতে ৫ হাজার টাকাও আসবে কি না সন্দেহ। আমরা ঋণের বোঝা নিয়ে এখন কী করব?”

সার, বীজ, কীটনাশক এবং সেচের খরচ দিন দিন বাড়ছে। সেই সাথে বেড়েছে কৃষি শ্রমিকের মজুরি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় যদি এমন দাম পাওয়া যায়, তবে কৃষি কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ছাড়া কৃষকের আর কোনো উপায় থাকবে না।

সদর উপজেলার আরেক কৃষক মোজাফফর হোসেন বলেন, “মাঠ থেকে সবজি তুলে হাটে আনতে যে পরিবহন খরচ লাগে, বিক্রির টাকা দিয়ে সেটাই শোধ করা যাচ্ছে না। অনেক কৃষক রাগে-দুঃখে ক্ষেতেই সবজি নষ্ট করার চিন্তা করছেন।”

কী বলছেন আড়তদাররা?

মহাস্থানগড় হাটের আড়তদার ও চয়ন ভাণ্ডারের মালিক মমিনুল ইসলাম জানান, সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা বা পাইকারের সংখ্যা অনেক কম। তিনি বলেন, “আমাদের হাটে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০টি আড়ত আছে। এখান থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ৫০ ট্রাক সবজি পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে আবহাওয়া ভালো থাকায় সবজির ফলন হয়েছে প্রচুর। একসাথে এত সবজি বাজারে আসায় এবং বাইরের পাইকার কম আসায় দাম পড়ে গেছে।”

আড়তদাররা আরও জানান, সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পচনশীল এসব পণ্য দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষকরা। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগায় এক শ্রেণির ফড়িয়া বা দালাল।

সমস্যার সমাধান কোথায়?

কৃষি প্রধান এই দেশে কৃষকরাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু প্রতি বছর শীত মৌসুমে এই একই চিত্র দেখা যায়। এই সমস্যা সমাধানে কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন:

১. সবজি সংরক্ষণাগার: প্রতিটি জেলায়, বিশেষ করে উৎপাদনশীল এলাকাগুলোতে সরকারিভাবে বিশেষায়িত সবজি হিমাগার তৈরি করা জরুরি। 

২. প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প: টমেটো, ফুলকপি বা অন্যান্য সবজি দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হলে কৃষকরা বাড়তি সবজি সেখানে বিক্রি করতে পারবেন। 

৩. বাজার মনিটরিং: উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত দামের পার্থক্য কেন এত বেশি, তা তদারকি করতে শক্তিশালী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা দরকার। 

৪. পরিবহন সুবিধা: কৃষকদের জন্য বিশেষ পণ্যবাহী ট্রেন বা কম খরচে পরিবহনের ব্যবস্থা করা গেলে ঢাকায় কম দামে সবজি পৌঁছানো সম্ভব হতো।


বগুড়ার মহাস্থান হাটের এই চিত্র কেবল একটি অঞ্চলের নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একদিকে শহরের মানুষ চড়া দামে সবজি কিনছেন, অন্যদিকে গ্রামের কৃষক পানির দরে সবজি বেচে নিঃস্ব হচ্ছেন।

“কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে”—এই স্লোগানটি কেবল কথার কথা না হয়ে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামীতে অনেক কৃষকই সবজি চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!