বিশ্ব রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ঘটনার জন্ম দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো ভিনদেশি রাষ্ট্রপ্রধান নয়, বরং খোদ নিজেকেই দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করলেন তিনি। রোববার (১১ জানুয়ারি ২০২৬) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) একটি ছবি পোস্ট করে এই ঘোষণা দেন ট্রাম্প, যা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে দাবি করার এই ঘটনা লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের বিতর্কিত পোস্ট
গত রোববার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একটি ছবি শেয়ার করেন। ছবির নিচে খুব স্পষ্ট করে লেখা ছিল যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিচ্ছেন। ঠিক এক সপ্তাহ আগে মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের এমন ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মাদুরো আটক ও রক্তক্ষয়ী অভিযান
এই গভীর সংকটের শুরু হয় গত ৩ জানুয়ারি। সেদিন মার্কিন সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক ঝটিকা ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের সরকারি বাসভবন থেকে আটক করা হয়। এরপর তাদের সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে উড়িয়ে এনে নিউইয়র্ক সিটিতে রাখা হয়।
বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রী মাদক পাচারের অভিযোগে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছেন। মার্কিন আদালতে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি চলছে। তবে মাদুরোকে আটকের এই অভিযানটি ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। জানা গেছে, ওই সংঘর্ষে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ১০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
তেলের রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল সমৃদ্ধ দেশ। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করার পেছনে মূল কারণ হিসেবে তেলের নিয়ন্ত্রণকে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের তদারকি এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র করবে।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন, ওয়াশিংটন অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখবে। তিনি জানান, দেশটির সরকার সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এবং উপযুক্ত সময়ে তেলের মালিকানা আবার ভেনেজুয়েলার সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মূলত দেশটির তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার একটি কৌশল।
ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার দ্বন্দ: ট্রাম্প বনাম ডেলসি
মাদুরো অপহৃত হওয়ার পরপরই ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীও ডেলসিকে সমর্থন জানায়।
ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের রোববারের ঘোষণা সব সমীকরণ উল্টে দিয়েছে। এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এমন একই দেশে দুজন ব্যক্তি নিজেকে প্রেসিডেন্ট দাবি করছেন। একদিকে ডেলসি রদ্রিগেজ, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই পরিস্থিতির ফলে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এবং প্রশাসনিক কাঠামো বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়েছে। একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিজেকে দাবি করতে পারেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের পণ্ডিতদের মধ্যেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
এই ঘটনা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব বিস্তারের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখছেন অনেকে। আগামী দিনগুলোতে ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








