বাংলাদেশের সিলেটের একটি স্কুল থেকে ওড়ানো সামান্য একটি গ্যাস বেলুন যে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে এমন হুলুস্থূল কাণ্ড বাধিয়ে দেবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওড়ানো সেই বেলুনটি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সোজা গিয়ে পড়ে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচরে। আর এতেই সেখানে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এমন অজ্ঞাত বস্তু আকাশ থেকে পড়তে দেখে স্থানীয়দের পাশাপাশি নড়েচড়ে বসে ভারতীয় পুলিশ প্রশাসনও।
রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিষয়টি নিয়ে বেশ কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি)। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গিলাছড়া দ্বীমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৫ বছর পূর্তি বা ডায়মন্ড জুবিলি উদযাপন করা হচ্ছিল। উৎসবমুখর পরিবেশে শুক্রবার ও শনিবার দুদিনব্যাপী চলে এই অনুষ্ঠান। স্কুলের এই বিশেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজকরা বিশাল আকৃতির একটি গ্যাস বেলুন উড়িয়েছিলেন। বেলুনটিতে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের বা অবদান রাখা তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির ছবিও সাঁটানো ছিল।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উৎসব চলাকালীন এক পর্যায়ে বাতাসের তোড়ে রশি ছিঁড়ে বেলুনটি আকাশে মুক্ত হয়ে যায় এবং বাতাসের প্রবাহে তা ভারতের আকাশসীমার দিকে চলে যায়।
ভারতে বেলুন উদ্ধার ও স্থানীয়দের আতঙ্ক
রোববার ভোরে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচর শহরের কাছে মাসিমপুর সুবেদারবস্তি এলাকায় একটি বিশাল আকৃতির বেলুন পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। সকালে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা মাঠে গবাদিপশু চড়াতে গিয়ে এই অদ্ভুত বস্তুটি আবিষ্কার করেন।
বেলুনটি যেখানে পড়েছিল, সেই মাসিমপুর এলাকাটি কৌশলগতভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর খুব কাছেই রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বিএসএফ-এর (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) কাছাড় ও মিজোরাম ফ্রন্টিয়ারের সদর দপ্তর। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত এমন একটি এলাকায় আকাশ থেকে রহস্যজনক বেলুন পড়তে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে বোমার আতঙ্ক বা গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে।
পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতা
আতঙ্কিত গ্রামবাসী বিষয়টি দ্রুত স্থানীয় ভিডিপি সম্পাদক সুমন দাসকে জানান। তিনি কালক্ষেপণ না করে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। বিষয়টির গুরত্ব অনুধাবন করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সিনিয়র পুলিশ সুপার (এসএসপি) পার্থপ্রতীম দাস।
পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বেলুনটি ঘিরে ফেলে এবং এর ভেতরে কোনো বিস্ফোরক বা ক্ষতিকারক গ্যাস আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে শুরু করে। পরবর্তীতে বেলুনটির বাতাস বের করে সেটি এসএসপি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
রহস্য উদঘাটন ও স্বস্তি
উদ্ধারকৃত বেলুনটি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হলেও প্রাথমিক তদন্তেই আসল রহস্য বেরিয়ে আসে। কাছাড় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) সুব্রত সেন স্থানীয় সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, এটি কোনো নাশকতার অংশ নয়।
তিনি জানান, বেলুনটিতে তিনজন ব্যক্তির ছবি প্রিন্ট করা ছিল এবং এটি যে কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওড়ানো হয়েছিল, তা বেলুনের গায়ে লেখা থেকেই স্পষ্ট হয়েছে। তদন্ত শেষে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, এটি বাংলাদেশ থেকেই বাতাসের তোড়ে উড়ে এসেছে। এই নিশ্চিতকরণের পর স্থানীয় জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, আকাশসীমা বা বাতাস কোনো কাঁটাতারের বেড়া মানে না। তবে সীমান্ত এলাকায় যেকোনো অজ্ঞাত বস্তু যে কতটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত।








