পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আবারও চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান যদি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া এবং ভারতবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, তবে দেশটিকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার এক প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী।
গত শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) দিল্লির মানেকশ সেন্টারে ‘ইউনিফর্ম আনভেইল্ড’ নামক এক সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত ‘সেনা সংবাদ’ শীর্ষক একটি ইন্টারেক্টিভ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি এই কড়া বার্তা দেন। ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
‘ভূগোল’ বনাম ‘ইতিহাস’: সেনাপ্রধানের কড়া জবাব
অনুষ্ঠানে ভারতের সেনাপ্রধানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গত বছর সংঘটিত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি যদি আবারও তৈরি হয়, তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী কীভাবে তার জবাব দেবে।
জবাবে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বেশ স্পষ্ট ও আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, “আমি এর আগেও যা বলেছি, তা যদি আপনারা শুনে থাকেন তারা (পাকিস্তান) যদি সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া এবং ভারতবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতেই থাকে, তবে তারা বিশ্বের মানচিত্রে ভূগোলের অংশ হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি কেবল ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদেরই নিতে হবে।” সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ভারতের সেনাপ্রধান পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
আলোচনার কেন্দ্রে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর প্রথম বার্ষিকী
জেনারেল দ্বিবেদীর এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এলো, যার কিছুদিন আগেই ভারত এবং দেশটির সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর প্রথম বার্ষিকী উদযাপন করেছে।
উল্লেখ্য, গত বছর (২০২৫ সালের ৭ মে) জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে একটি বড় ধরণের জঙ্গি হামলা হয়। সেই পহেলগাম হামলার জেরে ভারতীয় বিমান ও স্থলবাহিনী পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) একাধিক জঙ্গি অবকাঠামো লক্ষ্য করে এক বিধ্বংসী আক্রমণ চালায়। ভারতীয় সামরিক ইতিহাসে এই অভিযানটি মূলত ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে পরিচিত।
৮৮ ঘণ্টার সেই পরমাণু উত্তেজনা
‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরুর পর পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা বিমান ও সামরিক আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে ভারতের জোরালো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে পাকিস্তানের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সে সময় প্রায় ৮৮ ঘণ্টা ধরে তীব্র সামরিক উত্তেজনা চলেছিল, যা পুরো বিশ্বকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১০ মে সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের একটি জরুরি সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও দুই দেশের সীমান্তের ক্ষোভ যে কমেনি, তা ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যেই স্পষ্ট।
আঞ্চলিক শান্তিতে নতুন উদ্বেগের মেঘ
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সেনাপ্রধানের এই ধরণের বক্তব্য আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কাশ্মীর ইস্যু এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। দিল্লির এই কড়া হুঁশিয়ারির পর ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে কী ধরণের পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
পরিশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার শান্তি বজায় থাকা অত্যন্ত জরুরি। তবে ভারতের সেনাপ্রধানের এই “মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার” হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে যে, ভারত এখন আর পাকিস্তানের সীমান্ত সন্ত্রাসকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। এই ধরণের বাগযুদ্ধ যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা পুরো এশিয়া মহাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।








