দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার আকাশচুম্বী জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয় এখন কেবল একজন রুপালি পর্দার তারকা নন, বরং তামিলনাড়ুর রাজনীতির নতুন অধিপতি। সদ্য সমাপ্ত তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে)-এর অভাবনীয় সাফল্য পুরো ভারতকে চমকে দিয়েছে। মাত্র দুই বছর আগে গঠিত একটি দল নিয়ে ৬২ বছরের রাজনৈতিক প্রথা ভেঙে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার এই গল্পটি যেকোনো ব্লকবাস্টার সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর।
সাধারণ ছাত্র থেকে মহাতারকা হওয়ার যাত্রা
থালাপতি বিজয়ের শৈশব ও শিক্ষা জীবন ছিল আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই। তাঁর আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। চেন্নাইয়ের ফাতিমা ও বালালোক স্কুলে প্রাথমিক পাঠ চুকিয়ে তিনি লয়োলা কলেজে ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে। অভিনয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে তিনি ডিগ্রি শেষ করার আগেই কলেজ ছাড়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। আজ তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, কেবল একাডেমিক সার্টিফিকেট নয় নিষ্ঠা ও সঠিক লক্ষ্যই একজন মানুষের গন্তব্য নির্ধারণ করে দেয়।
সিনেমার পর্দা থেকেই শুরু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
অনেকেই মনে করেন বিজয়ের রাজনীতিতে আসা আকস্মিক, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে তাঁর প্রস্তুতি চলছিল দীর্ঘ সময় ধরে। ২০১০ সালের পর থেকে বিজয়ের প্রতিটি সিনেমা ছিল একেকটি সামাজিক হাতিয়ার।
- কাত্থি (২০১৪): কৃষকদের শোষণ ও করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠ।
- মার্সাল (২০১৭): স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও সরকারি করনীতির তীক্ষ্ণ সমালোচনা।
- সারকার (২০১৮): ভোটার সচেতনতা ও নির্বাচনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই।
- মাস্টার (২০২১): শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি এবং তরুণ প্রজন্মের সঠিক পথ প্রাপ্তি।
এসব সিনেমার মাধ্যমে তিনি নিজেকে কেবল অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার একজন আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
নির্বাচনে অবিশ্বাস্য জয় ও নতুন জোট সরকার
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে (DMK) ও এআইএডিএমকে (AIADMK)-এর দ্বৈত শাসন ভেঙে দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ২৩৪ আসনের মধ্যে এককভাবে ১০৮টি আসনে জয় পেয়ে সেই অসাধ্য সাধন করেছে বিজয়ের ‘টিভিকে’। এখন কংগ্রেস ও অন্যান্য ছোট তিন দলের সমর্থন নিয়ে তিনি সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় সিনেমার জগত থেকে বিদায় নিয়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসা তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তরুণ ভোটার ও কৃষকদের জন্য মাস্টারস্ট্রোক
বিজয়ের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তরুণ প্রজন্ম এবং প্রান্তিক কৃষক পরিবার। তাঁর একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি পুরো নির্বাচনি সমীকরণ বদলে দিয়েছে:
“দুই একরের কম জমি থাকা কৃষক পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে সরকার।”
নিজে কলেজ শেষ করতে না পারলেও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝে গ্রামীণ নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এই ঘোষণা তাঁর জন্য জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
‘থালাপতি’ থেকে মুখ্যমন্ত্রী: এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এমজিআর বা জয়ললিতার মতো মহাতারকাদের রাজনীতিতে আসার নজির থাকলেও বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তিনি এমন এক সময়ে রাজনীতিতে এলেন যখন সাধারণ মানুষ পুরনো দলগুলোর বিকল্প খুঁজছিল। বিজয়ের এই উত্থান প্রমাণ করেছে, মানুষের আবেগের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারলে যেকোনো কঠিন পাহাড় অতিক্রম করা সম্ভব। তামিলনাড়ুর মানুষ যে নামটিকে সিনেমার পর্দায় ভালোবেসে চিৎকার করতো, আজ সেই ‘থালাপতি’ই তাদের ভাগ্যের হাল ধরতে যাচ্ছে।








