ডিজিটাল দুনিয়ায় একসময় চ্যাটজিপিটিকে ভাবা হতো সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ ব্যক্তিগত সঙ্গী। যেখানে ই-মেইল লেখা বা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির বাইরেও মানুষ তাদের ভয়, উদ্বেগ এবং হতাশার কথা মন খুলে বলতো। কিন্তু সেই দিন এবার শেষ হতে চলেছে। ওপেনএআই-এর নতুন ফিচার ‘ট্রাস্টেড কনট্যাক্ট’ (Trusted Contact) আপনার ব্যক্তিগত কথোপকথনের গোপনীয়তায় এক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসছে।
কী এই ‘ট্রাস্টেড কনট্যাক্ট’ ফিচার
ওপেনএআই সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, চ্যাটজিপিটির সিস্টেমে যদি কোনো ব্যবহারকারীর কথায় আত্মক্ষতি, আত্মহত্যার ঝুঁকি বা গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে সিস্টেমটি চুপ থাকবে না। এআই এবং মানব পর্যবেক্ষক দল সেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবহারকারীর আগে থেকে নির্ধারিত ‘বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তির’ (বন্ধু বা পরিবারের সদস্য) কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেবে।
ফিচারটি যেভাবে কাজ করবে
ওপেনএআই এই ব্যবস্থাকে বলছে ‘ডিটেক্ট অ্যান্ড ভেরিফাই’ মডেল। এর কাজ হবে তিনটি ধাপে:
১. শনাক্তকরণ: প্রথমে স্বয়ংক্রিয় এআই সিস্টেম কথোপকথনের ভাষা থেকে ঝুঁকির তীব্রতা বুঝবে।
২. পর্যালোচনা: এরপর একটি বিশেষ ‘হিউম্যান মডারেশন টিম’ বা মানব পর্যবেক্ষক দল বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
৩. সতর্কবার্তা: যদি ঝুঁকি বাস্তব মনে হয়, তবে ব্যবহারকারীর চ্যাটের কোনো তথ্য ফাঁস না করেই কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘চেক-ইন’ করার বা খোঁজ নেওয়ার জন্য একটি মেসেজ পাঠানো হবে।
গোপনীয়তা বনাম নিরাপত্তা: শুরু হয়েছে বিতর্ক
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি ডিজিটাল নিঃসঙ্গতা দূর করতে একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু এর ফলে তৈরি হয়েছে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর ভয়। ব্যবহারকারীরা যদি মনে করেন তাদের কথা গোপন থাকছে না, তবে তারা আর এআই-এর কাছে মন খুলে কথা বলবেন না।
চিকিৎসকদের সংশয় ও মানবিক বিচক্ষণতা
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ফিচারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. সমীর পারিখ এবং ড. নিমেশ দেশাই-এর মতে:
- এআই কি মানুষের জটিল মানসিক অবস্থার সূক্ষ্ম পরিবর্তন সঠিকভাবে বুঝতে পারবে?
- একজন থেরাপিস্ট রোগীর পরিস্থিতি বুঝে যে মানবিক বিচক্ষণতা দেখান, একটি অ্যালগরিদমের পক্ষে তা কি সম্ভব?
- অনেক সময় সাময়িক হতাশাকে এআই হয়তো বড় কোনো সংকট ভেবে ভুল সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে।
পৃথিবী এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে যেখানে সফটওয়্যার হয়তো আমাদের কাছের মানুষের চেয়েও বেশি আমাদের মন বুঝতে পারছে। চ্যাটজিপিটির এই নতুন ফিচার হয়তো জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে মানুষ কি তবে আবার একা হয়ে পড়বে? কারণ, এআই হয়তো মেসেজ পাঠাতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে মানুষের মতো হাত ধরে পাশে দাঁড়াতে পারে না।








