সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পগুলো আবারও এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। ৪ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার আশেপাশে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প (উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর শিবপুর) অনুভূত হয়। এর আগে, ২১ নভেম্বর বাংলাদেশে ৫.৭ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, যাতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আফগানিস্তানেও নভেম্বরে ৬.৩ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং তার দুই মাস আগে ৬ মাত্রার প্রাণঘাতী কম্পন অনুভূত হয়। এক দশক আগে নেপালের ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প এবং ২০১০ সালের মিয়ানমারের ভূমিকম্প প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। কিন্তু কেন এই অঞ্চলে এত ঘন ঘন এবং বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের গভীরে জটিল টেকটোনিক প্লেটের বিন্যাসে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এত ঘন ঘন ভূমিকম্প কেন হয়?
দক্ষিণ এশিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করার মূল কারণ হলো এর ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থল।
জটিল টেকটোনিক প্লেটের বিন্যাস
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একাধিক সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি নিম্নলিখিত প্রধান টেকটোনিক প্লেটগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত:
- ভারতীয় প্লেট
- ইউরেশিয়ান প্লেট
- ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট
- বার্মিজ প্লেট
- সুন্দা প্লেট
- প্যাসিফিক প্লেট
প্লেটগুলোর নিরন্তর সংঘর্ষ
ভূমিকম্পের প্রধান কারণ হলো ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ। ভারতীয় প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ৫ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর দিকে সরে যাচ্ছে এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে চাপা পড়ছে বা সংঘর্ষ ঘটাচ্ছে। এই সংঘর্ষের ফলস্বরূপই জন্ম নিয়েছে সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালা। এই নিরন্তর সংঘর্ষের কারণে প্রচণ্ড ভূ-ভৌগোলিক চাপ সৃষ্টি হয় এবং এই চাপ ফল্ট লাইনগুলোতে সঞ্চিত হতে থাকে। যখন এই সঞ্চিত চাপ মুক্তি পায়, তখনই শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এই চাপ প্রাচীন ফল্ট লাইনগুলোকেও পুনরায় সক্রিয় করে তুলছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভূমিকম্প এত বিধ্বংসী কেন?
ভূমিকম্পের তীব্রতা এবং ধ্বংসাত্মকতা বাড়িয়ে তোলার পেছনে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণই বিদ্যমান।
জটিল ভৌগোলিক রূপ ও অগভীর ভূমিকম্প
দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক রূপ খুবই জটিল। এখানে উঁচু পর্বতমালা, গভীর উপত্যকা এবং নরম পলি বা বালুকাময় মাটি (বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বড় অংশ) রয়েছে। নরম পলিমাটি ভূমিকম্পের তরঙ্গকে বিবর্ধিত (Amplify) করে তোলে, ফলে কম্পনের তীব্রতা আরও বাড়ে।
এছাড়াও, এই অঞ্চলে টেকটোনিক প্লেটগুলোর পারস্পরিক অবস্থান এমনভাবে বিন্যস্ত যে, প্রায়শই অগভীর ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। অগভীর ভূমিকম্প পৃষ্ঠতলে তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে এবং বিস্তৃত এলাকায় বেশি ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়।
ঘনবসতি ও দুর্বল নির্মাণ মানদণ্ড
এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। কাবুল, ইসলামাবাদ, দিল্লি, কাঠমান্ডু এবং ঢাকার মতো বৃহৎ শহরগুলোর অবস্থান মূল ফল্ট সিস্টেমের কাছাকাছি হওয়ায় কোটি কোটি মানুষ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। দ্রুত নগরায়ন এবং যথাযথ নিরাপত্তা মানদণ্ড (Building Codes) না মেনে করা নির্মাণকাজও ভবন ও স্থাপনাগুলোকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, আফগানিস্তানের গ্রামীণ এলাকার মাটির ও পাথরের তৈরি বাড়িগুলো মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্পেও বহু হতাহতের কারণ হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কেমন পরিস্থিতি?
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব ফল্ট লাইন এবং ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
- ভারত: ভারতে বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট সিস্টেম রয়েছে। এখানে ইন্ট্রাপ্লেট ভূমিকম্প (একটি টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে ভূমিকম্প) অনুভূত হয়েছে, যা প্রাচীন ফল্ট লাইনের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কারণে ঘটে। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
- বাংলাদেশ: বাংলাদেশও একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যার মধ্যে রয়েছে ডাউকি ফল্ট, সিলেট ফল্ট এবং চেরদাং ফল্ট। বিশ্বের বৃহত্তম নদী ডেল্টা (সুন্দরবন ডেল্টা) বাংলাদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হওয়ায়, এর নরম পলিমাটি ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
- পাকিস্তান: পাকিস্তানেও বেশ কিছু প্রধান ফল্ট লাইন সক্রিয়, যেমন চামান ফল্ট এবং মেইন ম্যান্টল থ্রাস্ট। ২০০৫ সালের কাশ্মীরে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্পটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল, যাতে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়।
- নেপাল: নেপাল সরাসরি ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষসীমার ওপর অবস্থিত এবং এখানে বড় বড় ফল্ট সিস্টেম রয়েছে। এখানকার পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ভূমিধস এবং হিমবাহ হ্রদ উপচে বন্যার (Glacial Lake Outburst Flood) ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
সময়ের সঙ্গে কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে?
মানুষ ও পরিবেশগত কারণ, সেইসঙ্গে এই অঞ্চলের অনন্য ভূতাত্ত্বিক গঠন মিলিয়ে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে।
সঞ্চিত টেকটোনিক চাপ
শত শত বছর ধরে জমে থাকা টেকটোনিক চাপ বড় এবং আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে নেপাল, ভারত, ভুটান এবং পাকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে আট বা তার বেশি মাত্রার ‘বড় হিমালয়ান ভূমিকম্প’ হতে পারে।
হিমালয় অঞ্চল: সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান
যদিও প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প হয়, তবু হিমালয় অঞ্চল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সঞ্চিত প্রচণ্ড টেকটোনিক চাপের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের একটি। প্রাচীন এবং নিষ্ক্রিয় ফল্ট লাইনগুলোর পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠাও ভূমিকম্পের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, যা ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে দুর্যোগ মোকাবিলা এবং নির্মাণ মানদণ্ডের বিষয়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোর সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।
ভূমিকম্পপ্রবণতা সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ কেন?
উত্তর: এই অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের মতো একাধিক সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল ও সংঘর্ষের কারণে ভূমিকম্প বেশি হয়।
প্রশ্ন: কোন দুটি প্রধান প্লেটের সংঘর্ষের ফলে হিমালয় সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর: ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন: ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর কতটুকু সরছে?
উত্তর: ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর প্রায় ৫ সেন্টিমিটার করে উত্তর দিকে সরছে।
প্রশ্ন: অগভীর ভূমিকম্প কেন বেশি ধ্বংসাত্মক হয়?
উত্তর: অগভীর ভূমিকম্প পৃষ্ঠতলের কাছাকাছি হওয়ায় এটি বিস্তৃত এলাকার পৃষ্ঠকে তীব্রভাবে কাঁপিয়ে তোলে, ফলে ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বাড়ে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রধান সক্রিয় ফল্ট লাইনগুলোর নাম কী?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রধান ফল্ট লাইনগুলোর মধ্যে রয়েছে ডাউকি ফল্ট, সিলেট ফল্ট এবং চেরদাং ফল্ট।
প্রশ্ন: টমেটো কি ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে?
উত্তর: ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে নয়। (প্রশ্ন সংশোধনের পর উত্তর: টমেটোতে লাইকোপেন থাকে যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে)।
প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ায় ভূমিকম্প বিধ্বংসী হওয়ার অন্যতম কারণ কী?
উত্তর: নরম পলি বা বালুকাময় মাটি (যা কম্পন বিবর্ধিত করে) এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান।
প্রশ্ন: বড় হিমালয়ান ভূমিকম্পের মাত্রা কত হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন?
উত্তর: বিজ্ঞানীরা আট বা তার বেশি মাত্রার ‘বড় হিমালয়ান ভূমিকম্প’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
প্রশ্ন: নেপাল কেন এত বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ?
উত্তর: নেপাল সরাসরি ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষসীমার ওপর অবস্থিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আফগানিস্তানে রেকর্ড হওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্পের মাত্রা কত ছিল?
উত্তর: সম্প্রতি আফগানিস্তানে রেকর্ড হওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬.৩।








