সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিরাট সুখবর! দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে যাচ্ছে পে কমিশন। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন স্তরের একজন কর্মচারীর মোট বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সরকারি চাকরিজীবীরা অনেক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন এবার মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশ করতে যাচ্ছে। আগামী বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে কার বেতন কত?
পে কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বা বেসিক স্যালারি বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- সর্বনিম্ন বেতন: বর্তমানে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
- সর্বোচ্চ বেতন: সর্বোচ্চ পর্যায়ে মূল বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যা বর্তমানে ৭৮ থেকে ৮৬ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৪২ হাজার টাকার হিসাবটি যেভাবে এল:
কমিশনের তথ্যমতে, একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারী যদি ঢাকায় চাকরি করেন, তবে তিনি মূল বেতনের ৬৫ শতাংশ বাসা ভাড়া পান। ২০ হাজার টাকা মূল বেতন হলে, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ সব মিলিয়ে মাস শেষে তার পকেটে আসবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। বর্তমানে যা সর্বসাকুল্যে ১৭ হাজার টাকার আশেপাশে।
পে কমিশনের প্রস্তাব ও বাজেটে বরাদ্দ
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন পে কমিশন জানিয়েছে, তারা বর্তমান বাজার দর ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করেই এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। কমিশনের এক সদস্য জানান, গ্রেড সংখ্যা ২০টিই থাকছে, তবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৯ থেকে কমিয়ে ১:৮ করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয় এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রস্তুতিও রেখেছে।
- চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
- মোট বরাদ্দ ৮৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বর্তমান বনাম প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো
২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে বেতন পাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা। সেই তুলনায় বর্তমান প্রস্তাবনাটি একটি বড় উল্লম্ফন।
| বিবরণ | বর্তমান (২০১৫ স্কেল) | প্রস্তাবিত (২০২৫ স্কেল) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন | ৮৬,০০০ টাকা (মুখ্য সচিব) | ১,৬০,০০০ টাকা |
| সর্বনিম্ন মোট বেতন (ঢাকা) | ১৭,০০০ টাকা (আনুমানিক) | ৪২,০০০ টাকা (আনুমানিক) |
বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা ও বাস্তবতা
প্রস্তাবনাটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পে কমিশন তাদের কাজ করলেও বাস্তবায়ন করাটা ভিন্ন বিষয়। এর পেছনে প্রধান কারণ সরকারের রাজস্ব ঘাটতি।
সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করলেও, অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি দেখা গেছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জানুয়ারি থেকে মূল বেতন বা ভাতার যেকোনো একটি অংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। বাকিটা পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো এবং ৪২ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতনের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে সাধারণ কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা। দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট কর্মচারীরা এখন তাকিয়ে আছেন প্রধান উপদেষ্টার সিদ্ধান্তের দিকে। বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং কমিশনের ইতিবাচক রিপোর্ট আশা জাগালেও, শেষ পর্যন্ত এটি কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








