কাশ্মীরের শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে আবারও নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। অঞ্চলটিকে ভারত নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করলেও, চীন সাফ জানিয়ে দিয়েছে এটি তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড। সম্প্রতি শাকসগামে চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে ভারতের আপত্তির জবাবে বেইজিং কড়া বার্তা দিয়েছে। এই ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শাকসগাম তাদের ভূখণ্ড এবং সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করা তাদের সার্বভৌম অধিকার।
বেইজিংয়ের কড়া বার্তা ও অবস্থান
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং ভারতের সমালোচনার কড়া জবাব দেন। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই)-এর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিজেদের ভূখণ্ডে অবকাঠামো নির্মাণ করা চীনের জন্য ‘সম্পূর্ণভাবে ন্যায্য’।
মাও নিং জোর দিয়ে বলেন, “আপনি যে ভূখণ্ডের কথা বলছেন (শাকসগাম উপত্যকা), সেটি চীনের।”
চীনের এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, তারা ভারতের আপত্তিকে পাত্তাই দিচ্ছে না এবং ওই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তারা অনড়।
ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ঐতিহাসিক দাবি
এর আগে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শাকসগাম উপত্যকা ইস্যুতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছিল। ভারতের মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, শাকসগাম উপত্যকা ভারতের ভূখণ্ড এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভারত প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।
ভারতের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট:
- ১৯৬৩ সালের চুক্তি প্রত্যাখ্যান: ভারত ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের মতে, এই চুক্তিটি ‘অবৈধ এবং অকার্যকর’।
- অবিচ্ছেদ্য অংশ: জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড অংশ বলে দাবি করে নয়াদিল্লি।
- বাস্তবতা বদলের চেষ্টা: শাকসগাম উপত্যকায় ‘স্থল বাস্তবতা বদলের’ যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে ভারত ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।
- সিপিইসি প্রসঙ্গ: চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি-কেও ভারত স্বীকৃতি দেয় না, কারণ এটি বিতর্কিত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে গেছে।
১৯৬৩ সালের চুক্তি ও চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক
ভারতের আপত্তির জবাবে চীনের মুখপাত্র মাও নিং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে আনেন। তিনি বলেন, ১৯৬০-এর দশকে চীন ও পাকিস্তান একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং দুই দেশের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে। এটিকে তিনি ‘দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে চীন ও পাকিস্তানের অধিকার’ বলে উল্লেখ করেন।
এছাড়া চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার উদ্যোগ, যার মূল লক্ষ্য স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তি বা করিডোর কাশ্মীর ইস্যুতে চীনের অবস্থানে কোনো প্রভাব ফেলে না।
ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ: এক দীর্ঘ অমীমাংসিত অধ্যায়
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নতুন কিছু নয়। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। যদিও ২০২৪ সালে উত্তেজনা কমাতে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছায় এবং সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু পদক্ষেপ নেয়, তবুও মূল সমস্যার সমাধান এখনো অধরা।
- অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে দ্বন্দ্ব: কেবল শাকসগাম নয়, অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। চীন এই অঞ্চলকে ‘জাংনান’ বা দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে, যা ভারত বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
- নাম পরিবর্তন: চীন বিভিন্ন সময়ে অরুণাচলের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন করেছে, যার কড়া জবাব দিয়েছে নয়াদিল্লি।
শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে চীনের এই নতুন দাবি এবং ভারতের পাল্টা অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








