“ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল।” এই প্রবাদের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় যখন কেউ বরিশালের বানারীপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মায়াবী সন্ধ্যা নদীর দেখা পান। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদীর মাঝে সন্ধ্যা নদী কেবল একটি জলাধার নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি।
৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি যুগে যুগে তার আপন রূপ আর সম্পদে সমৃদ্ধ করে চলেছে দক্ষিণবঙ্গের জনপদকে। আজ আমরা জানবো এই নদীর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এর সাথে মিশে থাকা হাজারো মানুষের জীবনচিত্র।
সন্ধ্যা নদীর ভৌগোলিক রূপরেখা
সন্ধ্যা নদীটি বরিশাল জেলার একটি অন্যতম প্রধান নদী। এটি আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার কঁচা নদীতে গিয়ে মিশেছে। বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির প্রায় পাঁচ মাইল দীর্ঘ একটি অংশ এই অঞ্চলের মানচিত্রকে এক অনন্য সৌন্দর্য দান করেছে। এর শান্ত অথচ প্রবাহমান জলরাশি পর্যটক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাইকেই মুগ্ধ করে।
জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস: সন্ধ্যা নদীর ইলিশ
সন্ধ্যা নদী বলতেই সবার আগে মাথায় আসে এর রূপালি ইলিশের কথা। এই নদীর ইলিশ সারা দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় হাজার হাজার জেলে পরিবারের একমাত্র ভরসা এই নদী।
- মৎস্য আহরণ: প্রতিদিন শত শত নৌকা এই নদীতে মাছ শিকারে নামে।
- অর্থনৈতিক গুরুত্ব: নদী কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও মৎস্য আহরণ এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস।
ঐতিহ্যবাহী ভাসমান ধান-চালের হাট
সন্ধ্যা নদীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর ভাসমান হাট। প্রতি সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার এখানে ধান ও চালের এক বিশাল হাট বসে। শত শত নৌকায় করে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকার ও চাষিরা এখানে আসেন।
- কুঠিয়াল ব্যবসা: সন্ধ্যা নদীকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে ‘কুঠিয়াল’ ব্যবসা বা চালের আড়তদারি টিকে আছে।
- শস্য পরিবহনের পথ: বরিশালের ধান ও চাল রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো এই নদীপথ। সরাসরি লঞ্চ যোগাযোগ থাকায় খরচ কম এবং যাতায়াত সহজ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছে সন্ধ্যা নদী এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
কবির স্মৃতিতে মায়াবী সন্ধ্যা
বিখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল এই সন্ধ্যা নদী। তিনি নদীটিকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, সুদূর কলকাতায় বসেও বারবার এই নদীর তীরে ফিরে আসার ব্যাকুলতা প্রকাশ করতেন। নদীর মায়াবী রূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি লিখেছিলেন তার জনপ্রিয় বই ‘সন্ধ্যা নদীর জলে’। কবির লেখায় এই নদী পেয়েছে এক অলৌকিক এবং কাব্যিক মর্যাদা।
মানতা সম্প্রদায়: নৌকাই যাদের জীবন ও মরণ
সন্ধ্যা নদীর বুকে এক অদ্ভুত জীবনধারা লক্ষ্য করা যায়, যা হলো মানতা সম্প্রদায়ের জীবন।
- ঘর-সংসার: এই সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব কোনো ভূমি নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাদের ঠিকানা কেবল একটি নৌকা।
- জীবন সংগ্রাম: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে তারা নদীতে ভেসে মাছ ধরে জীবনযাপন করে।
- শেষ বিদায়: তাদের নিজস্ব কোনো ভূমি বা কবরস্থান নেই। লোকমুখে প্রচলিত আছে, আগে এই সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে তাদের দেহ নদীতেই ভাসিয়ে দেওয়া হতো, যদিও বর্তমান সময়ে কিছু পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা: ‘মিনি কুয়াকাটা’
সন্ধ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বাইপাস সড়কটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মিনি কুয়াকাটা’ হিসেবে পরিচিত। গোধূলি লগ্নে যখন সূর্য ডুবু ডুবু হয়, তখন নদীর শান্ত জলের ওপর সূর্যাস্তের প্রতিফলন দেখতে হাজারো মানুষের ভিড় জমে এখানে। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেকোনো মানুষের ক্লান্তি দূর করে এক নিমিষেই।
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া পালতোলা নৌকা
এক সময় সন্ধ্যা নদী মুখরিত থাকতো শত শত মাঝির কণ্ঠ আর শয়ে শয়ে পালতোলা নৌকায়। বাতাসের গতিতে পাল উড়িয়ে নৌকা চালানোর সেই দৃশ্য এখন কেবলই অতীত। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে পালের বদলে এসেছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। মাঝির সেই ভাটিয়ালি গান এখন আর আগের মতো শোনা যায় না, যা এই নদীর ঐতিহ্যে কিছুটা হলেও ভাটা ফেলেছে।
সন্ধ্যা নদী কেবল একটি নদী নয়, এটি বরিশালের কৃষি, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা এবং এর নাব্যতা ধরে রাখা জরুরি, যাতে আগামীর প্রজন্মও সন্ধ্যা নদীর মায়াবী রূপ এবং এর সুস্বাদু ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে।








