বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ বলা হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতকে। কিন্তু বিভিন্ন দুর্যোগ আর আর্থিক ঝুঁকির কারণে এই খাতের উদ্যোক্তারা প্রায়ই বিপাকে পড়েন। এবার সেই ঝুঁকি মোকাবেলায় এবং উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে এক দারুণ সুযোগ নিয়ে এসেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। আপনার যদি থাকে বীমা সংক্রান্ত কোনো উদ্ভাবনী বা নতুন আইডিয়া (Innovative Idea), তবে আপনি জিতে নিতে পারেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা!
এসএমই ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথভাবে চালু করেছে ‘ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফান্ড’। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা আইডিয়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে।
ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফান্ড আসলে কী?
সহজ কথায়, এটি একটি প্রতিযোগিতা। ব্যবসায়িক ক্ষতি, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যে ক্ষতির মুখে পড়েন, তা কাটিয়ে উঠতে বীমা বা ইন্স্যুরেন্স কীভাবে কাজ করতে পারে সে বিষয়ে নতুন ধারণা বা সমাধান খোঁজার জন্যই এই ফান্ডের ব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার (রাজধানীর মতিঝিলে) এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই ফান্ডের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার করে পুরস্কার দেওয়া হবে। বর্তমান বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৯ লাখ টাকা। এই অর্থ উদ্যোক্তাদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
কেন এই উদ্যোগ নেওয়া হলো?
আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন গ্রামের ছোট ছোট উদ্যোক্তারা। তাদের সুরক্ষার কথা ভেবেই এই উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “এই ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফান্ড বা উদ্ভাবনী তহবিল এমন সব বীমা সমাধানকে উৎসাহিত করবে যা আগে ছিল না। এর ফলে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং বিশেষ করে যারা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা করছেন, তারা আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকবেন।”
দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের বাস্তবতা
বাংলাদেশে এসএমই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই খাতে প্রায় ৩ কোটি মানুষ কাজ করছেন। অথচ, এত বড় একটি খাত হওয়া সত্ত্বেও এখানকার উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ বা আর্থিক সুবিধা খুব কমই পান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কিছু চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরা হয়:
- দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ সিএমএসএমই (CMSME) উদ্যোক্তা রয়েছেন।
- এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক উদ্যোক্তা সরাসরি ব্যাংক ঋণ পান।
- ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাত্র ১৪ শতাংশ উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা পান।
- প্রায় ৭৭ শতাংশ উদ্যোক্তাই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতার বাইরে।
এই বিশাল সংখ্যক উদ্যোক্তা যখন কোনো বিপদে পড়েন, তখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় থাকে না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাইরে বীমা সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই ‘ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ চালু করা হয়েছে।
এসএমই ফাউন্ডেশন ও ইউএনডিপি’র নতুন পথচলা
শুধুমাত্র পুরস্কার দেওয়াই শেষ নয়, এসএমই খাতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য এই অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশন ও ইউএনডিপি একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এই দুই সংস্থা উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে।
চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন যেভাবে
আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, এই প্রতিযোগিতায় কীভাবে অংশ নেওয়া যাবে? খুব সহজেই আপনি আবেদন করতে পারবেন।
- কোথায় আবেদন করবেন: এসএমই ফাউন্ডেশন এবং ইউএনডিপি-র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে আবেদনের লিংক পাওয়া যাবে।
- কারা আবেদন করবেন: যাদের এমন কোনো উদ্ভাবনী বীমা মডেল বা আইডিয়া আছে যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি কমাতে পারে।
সরকারের জাতীয় শিল্পনীতি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে এই উদ্যোগ এক বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে কাজ করে আসা এসএমই ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তাকে সহায়তা করেছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ নারী। এবারের এই ৫০ লাখ টাকার ফান্ড বা পুরস্কার সেই অগ্রযাত্রাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তাই আর দেরি কেন? আপনার যদি থাকে কোনো যুগান্তকারী আইডিয়া, তবে আজই খোঁজ নিন এবং লুফে নিন এই বিশাল সুযোগ।








