দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। টানা দুই দফা কমার পর এবার এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়ানো হয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম। দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণকারী সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে এই মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এবার প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪৩২ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দেশের ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে এক ভরি ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হবে ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা।
আজ সোমবার (২২ জুন) সকাল বেলা এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের সব মানুষকে এই তথ্য জানিয়েছে বাজুস। সংগঠনটি জানিয়েছে, নতুন এই নির্ধারিত দাম আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকেই সারা দেশে কার্যকর করা হয়েছে।
নতুন মূল্যে স্বর্ণের দাম: কোন ক্যারেটের কত দাম?
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বা সরবরাহ মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং দেশীয় বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিচে বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের নতুন মূল্য তালিকা দেওয়া হলো (ভ্যাটসহ):
| স্বর্ণের ক্যারেট ও ধরন | প্রতি ভরির নতুন দাম (টাকা) | ভরি (গ্রাম হিসাবে) |
| ২২ ক্যারেট | ২,৩০,৭৭২ টাকা | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
| ২১ ক্যারেট | ২,২০,৩৯১ টাকা | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৮৯,২৪৮ টাকা | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৫৪,৬০৬ টাকা | ১১.৬৬৪ গ্রাম |
স্বর্ণের দামের এই বিশাল লাফের কারণে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে যারা গহনা কেনার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের এখন অতিরিক্ত টাকা বাজেট করতে হবে।
কেন হঠাৎ করে বাড়ল স্বর্ণের দাম?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, মাত্র কয়েকদিন আগেই যেখানে স্বর্ণের দাম কমল, সেখানে হঠাৎ করে আবার এত টাকা কেন বাড়ল? বাজুসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
১. আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা।
২. দেশের ভেতরের বাজারে তেজাবি বা খাঁটি স্বর্ণের সরবরাহ ও তার মূল্য।
গত কয়েকদিনে স্থানীয় বাজারে খাঁটি স্বর্ণের সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর দাম অনেক বেড়ে গেছে। যখন বাজারে কোনো জিনিসের সরবরাহ কমে যায় এবং চাহিদা বেশি থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার দাম বাড়ে। বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারের এই তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির কারণেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
আগের দামের সাথে তুলনা: ২০ জুনের চিত্র কেমন ছিল?
এই দাম বাড়ার ঠিক দুই দিন আগে, অর্থাৎ গত ২০ জুন সকালে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমিয়েছিল বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেদিন প্রতি ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা কমানো হয়েছিল।
২০ জুনের মূল্য তালিকা অনুযায়ী ভ্যাটসহ দাম কেমন ছিল, তা একবার দেখে নেওয়া যাক:
- ২২ ক্যারেট: ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪০ টাকা।
- ২১ ক্যারেট: ২ লাখ ১৬ Ignored ১৯২ টাকা।
- ১৮ ক্যারেট: ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯১ টাকা।
- সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯০ টাকা।
২০ জুনের সেই দাম কমার স্বস্তি মাত্র ৪৮ ঘণ্টাও স্থায়ী হলো না। সোমবার সকাল ১০টা বাজতেই সেই কমার আনন্দের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ দাম বাড়িয়ে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হলো। এর ফলে আগের তুলনায় প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাদের এখন ৪ হাজার টাকারও বেশি বাড়তি দিতে হবে।
২০২৬ ও ২০২৫ সালে স্বর্ণের দামের ওঠানামার রেকর্ড
বাংলাদেশের ইতিহাসে গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তন সাধারণ ক্রেতাদের বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলছে। বাজুসের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি মাসেই একাধিকবার স্বর্ণের দাম বাড়ানো বা কমানো হচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান
চলতি ২০২৬ সালের আজ ২২ জুন পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যায়, দেশের বাজারে মোট ৭৯ বার স্বর্ণের দামের পরিবর্তন বা সমন্বয় করা হয়েছে। এই ৭৯ বারের মধ্যে:
- দাম বাড়ানো হয়েছে: ৪০ দফা
- দাম কমানো হয়েছে: ৩৮ দফা
- ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে: ১ দফা
এই হিসাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, চলতি বছরে দাম কমার এবং বাড়ার প্রতিযোগিতা প্রায় সমান সমান হলেও, শেষ পর্যন্ত বাড়ার পাল্লাই ভারী রয়েছে।
বিগত ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান
যদি আমরা গত ২০২৫ সালের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে সে বছরও স্বর্ণের বাজার ছিল অত্যন্ত অস্থির। পুরো ২০২৫ সাল জুড়ে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে:
- দাম বাড়ানো হয়েছিল: ৬৪ বার
- দাম কমানো হয়েছিল: ২৯ বার
বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছরেও একই ধারা বজায় রয়েছে এবং বছর শেষ হতে হতে এই সমন্বয়ের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ক্রেতা ও জুয়েলারি ব্যবসার ওপর এর প্রভাব
স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পার হয়ে যাওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। দাম যখন অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ গহনা কেনা কমিয়ে দেয়। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ বাজারে গিয়ে স্বর্ণ কিনতে চাচ্ছেন না।
সাধারণ ক্রেতাদের ভোগান্তি
বাঙালি সংস্কৃতিতে বিয়ে বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের গহনা দেওয়া একটি ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমান দামের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এক ভরি বা দুই ভরি স্বর্ণ কেনাও এখন আকাশকুসুম কল্পনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে এখন আসল স্বর্ণের পরিবর্তে ইমিটেশন বা রুপার গহনার দিকে ঝুঁকছেন।
ব্যবসায়ীদের সংকট
স্বর্ণের দাম এভাবে বারবার ওঠানামা করার কারণে শো-রুমের মালিকরা সঠিক উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। আজ এক দামে স্বর্ণ কিনলে কালই সেই দাম কমে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ করে বেড়ে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগ করতেও ভয় পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
স্বর্ণের বাজারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
স্বর্ণের দামের এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা কবে থামবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এটি নির্ভরশীল, তাই আগামী দিনগুলোতে দাম আরও বাড়তে পারে বা কমতে পারে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, বাজুসের উচিত এমন একটি স্থিতিশীল নীতি তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত কিছুদিন একই দামে স্বর্ণ কিনতে পারে। বারবার দামের এই বড় লাফ সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর চাপ যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি বাজারের ভারসাম্যও নষ্ট করছে।








