হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়সাতক্ষীরায় জমকালো আয়োজনে শুরু হলো ‘ফল মেলা ২০২৬’: হরেক রকমের দেশি ফলের...
spot_img

সাতক্ষীরায় জমকালো আয়োজনে শুরু হলো ‘ফল মেলা ২০২৬’: হরেক রকমের দেশি ফলের সমাহার

“করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” এই চমৎকার ও দেশপ্রেমের মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে সাতক্ষীরায় আজ থেকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘ফল মেলা ২০২৬’। দেশের ফলজ সম্পদ ও পুষ্টির চাহিদা মেটানোর একটি মহান লক্ষ্য নিয়ে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

আজ ২৩ জুন ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ মেলাটি আগামী ২৫ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সর্বস্তরের দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সাতক্ষীরার খামারবাড়ী চত্বরে আয়োজিত এই মেলায় প্রথম দিনেই ফলপ্রেমী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ হরেক রকমের ফল ও গাছ দেখতে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় জমাচ্ছেন।

মেলার মূল উদ্দেশ্য ও স্লোগানের গভীর তাৎপর্য

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি প্রধান অঞ্চল হিসেবে সব সময়ই বেশ পরিচিত। এবারের ফল মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় সাধারণ মানুষকে বেশি বেশি ফল গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা এবং আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় দেশি ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। মেলার মূল ব্যানারে “করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস” এবং “ফলই বল” এর মতো অত্যন্ত শিক্ষণীয়, আকর্ষণীয় ও সচেতনতামূলক স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের মেলার মাধ্যমে বর্তমান ও তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া অনেক দুর্লভ ও ঐতিহ্যবাহী দেশি ফলের পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব। একই সাথে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কীভাবে বারো মাস ফল সংরক্ষণ ও লাভজনকভাবে চাষ করা যায়, সেই আধুনিক প্রযুক্তিও স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বর্ণিল সাজে মেলার প্রবেশদ্বার ও ভেতরের প্রাণবন্ত পরিবেশ

মেলার মূল ফটক বা প্রবেশদ্বারটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও গ্রামীণ আবহে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা দূর থেকেই মানুষের নজর কাড়ছে। গেটের স্তম্ভগুলোতে জীবন্ত গাছের মতো করে কাঁচা-পাকা কাঁঠাল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা আগত দর্শনার্থী ও পথচারীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। প্রবেশদ্বারের এই সুন্দর ও শৈল্পিক রূপ পুরো মেলার সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

মেলার ভেতরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি নার্সারি এবং উন্নত কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হরেক রকমের ফলের স্টল বসানো হয়েছে। মেলায় আসা দর্শনার্থী এবং ছোট শিশুদের মাথায় “ফল মেলা-২০২৬” লেখা সুন্দর রঙিন কাগজের মুকুট বা ক্যাপ শোভা পেতে দেখা গেছে, যা পুরো মেলা প্রাঙ্গণে এক অনাবিল ও আনন্দের উৎসবমুখর আমেজ তৈরি করেছে। মেলার চারপাশের পরিবেশ যেন এক টুকরো সবুজ ও ফলের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

হরেক রকমের দেশি ফলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

এবারের মেলার অন্যতম একটি দারুণ ও প্রশংসনীয় দিক হলো শুধু ফল প্রদর্শন বা কেনাবেচাই নয়, বরং বিভিন্ন ফলের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা ও ঔষধি গুণ সাধারণ মানুষের সামনে সহজভাবে তুলে ধরা। মেলার চারপাশের বোর্ডে ও ফেস্টুনের মাধ্যমে বিভিন্ন চেনা-অচেনা ফলের গুনাগুণ প্রদর্শন করা হয়েছে, যা দেখে সাধারণ মানুষ রোগমুক্ত ও নিরাপদ জীবন গড়ার দারুণ অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।

জামের অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্য উপকারিতা

আমাদের চেনা দেশি ফল জামের রয়েছে অনেক গুণ। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সরাসরি সাহায্য করে। সেই সাথে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ হওয়ায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং হজম প্রক্রিয়াকে সচল রাখে।

লেবুর গুনাগুণ ও শরীরের ফিটনেস

লেবুকে বলা হয় ভিটামিন সি-এর খনি। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় লেবু রাখলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি শরীরকে ফিট ও চর্বিমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। একই সাথে মানুষের হজম শক্তিতে বড় ধরনের সহায়তা করে এবং ত্বক উজ্জ্বল ও সুন্দর রাখতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

লিচুর পুষ্টি ও সতেজতা

গ্রীষ্মকালীন জনপ্রিয় ফল লিচুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরে সঠিক রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে এবং ত্বক সুন্দর, নরম ও সতেজ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।

ফলের নামপ্রধান পুষ্টি উপাদানমূল স্বাস্থ্য উপকারিতা
জামঅ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সিব্ল্যাড সুগার নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস
লেবুউচ্চ ভিটামিন সি ও সাইট্রিক অ্যাসিডহজম শক্তি বৃদ্ধি ও ত্বক উজ্জ্বল করা
লিচুভিটামিন সি ও মিনারেলসরক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি ও ত্বক সতেজ রাখা

ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ও ড্রিপ সেচ পদ্ধতির প্রদর্শনী

মেলা প্রাঙ্গণে শুধু ফলের সমাহারই সাজানো হয়নি, বরং আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তিরও চমৎকার প্রদর্শন করা হচ্ছে। বর্তমান যুগের উপযোগী “ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি” এবং “ড্রিপ সেচ পদ্ধতি” সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তবমুখী ধারণা দেওয়া হচ্ছে। মেলার তথ্য বোর্ড থেকে জানা যায়, এটি ড্রিপ সেচ পদ্ধতির মাধ্যমে ফসলের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দেওয়ার একটি আধুনিক ব্যবস্থা।

ড্রিপ সেচ পদ্ধতির সুবিধাসমূহ

  • পানির অপচয় রোধ: এই পদ্ধতিতে সাধারণ সেচের চেয়ে প্রায় ৭০% পর্যন্ত পানির অপচয় কমানো সম্ভব।
  • শ্রম ও খরচ হ্রাস: স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে শ্রমিকের খরচ এবং বাড়তি পানির পাম্প চালানোর খরচ অনেক কমে যায়।
  • বেশি ফলন: গাছের গোড়ায় সরাসরি ও পরিমিত পানি পৌঁছানোর কারণে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়।

বর্তমান যুগে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চাষাবাদে যে নানামুখী প্রাকৃতিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করে কীভাবে কম পানি ব্যবহার করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দ্বিগুণ ফলন পাওয়া যায়, তা মেলার স্টলগুলো থেকে বিনামূল্যে কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে সাতক্ষীরার স্থানীয় ফল চাষিরা অনেক বেশি লাভবান ও উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

দর্শনার্থী ও স্থানীয় ফল চাষিদের প্রতিক্রিয়া

মেলার প্রথম দিনেই আসা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এই আয়োজনে অত্যন্ত আনন্দিত। বিশেষ করে শহরের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে শিশুদের নিয়ে এসে দেশি ফল ও গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে অভিভাবকরা কৃষি বিভাগকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

স্থানীয় ফল চাষিরা জানান, এই মেলার মাধ্যমে তারা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি যেমন ড্রিপ সেচ ও ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির বিষয়ে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন। এটি তাদের আগামী দিনে ফল চাষে খরচ কমাতে এবং উৎপাদন বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করবে।

অর্থ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

“ফল গাছ লাগিয়ে ভরবো দেশ, অর্থ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ” এই প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে সাতক্ষীরার এই ফল মেলাটি জেলার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করবে। দেশি ফলের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার এক দারুণ বার্তা দিচ্ছে এই মেলা।

তিন দিনব্যাপী এই মেলাটি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে। আপনি যদি সাতক্ষীরা বা এর আশেপাশের এলাকার বাসিন্দা হয়ে থাকেন, তবে পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সন্তানদের নিয়ে দেশি ফলের এই বিশাল সমাহার ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি দেখতে খামারবাড়ী চত্বরের এই মেলায় আজই চলে আসতে পারেন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!