হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
Wednesday, August 12, 2026
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজধানীতে ৪৪৫ ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চিহ্নিত
spot_img

বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজধানীতে ৪৪৫ ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চিহ্নিত

সম্প্রতি পুরো এশিয়া অঞ্চলজুড়ে ভূমিকম্পের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। জাপান, ফিলিপাইন, ভারত এবং প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পরপর ঘটা এসব শক্তিশালী কম্পন বাংলাদেশেও একটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো বড় কোনো ভূমিকম্প আসবেই—এমন নিশ্চিত বার্তা দেয় না। তবে বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান এবং ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে বড় ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকি কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে এ অঞ্চলে ঘটা একাধিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যেকোনো সময় প্রকৃতি আবার রুদ্ররূপ ধারণ করতে পারে।

ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছুদিন ধরেই একটি বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন: রাজধানী ঢাকায় যদি ৬ থেকে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘিঞ্জি গলি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণের কারণে এই ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে গেছে।

এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শক্তিশালী ভূমিকম্পে অনিয়ম করে তৈরি করা হাজার হাজার বহুতল ভবন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়তে পারে। এর ফলে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ভবনের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা, উদ্ধারকাজ চালানো এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো জরুরি ব্যবস্থাগুলোও থমকে যেতে পারে অপ্রশস্ত রাস্তার কারণে। তাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

ভূমিকম্পের ইতিহাস ও বিশেষজ্ঞদের মারাত্মক আশঙ্কা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যেকোনো সময় ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ভূতাত্ত্বিক গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করে তিনি বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বছর পরপর বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক চক্র পুনরাবৃত্ত হয়।

অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:

  • ১৮৬৯ সাল (কাছাড় ভূমিকম্প): ৭.৫ মাত্রার ভয়াবহ কম্পন।
  • ১৮৮৫ সাল (বেঙ্গল ভূমিকম্প): ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ধ্বংসযজ্ঞ।
  • ১৯১৮ সাল (শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প): ৭.৬ মাত্রার প্রচণ্ড ধাক্কা।
  • ১৯৩০ সাল (ধুবড়ি ভূমিকম্প): ৭.১ মাত্রার বিধ্বংসী কম্পন।

অধ্যাপক আনসারী স্পষ্ট করে বলেছেন, ইতিহাস বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ২০০ বছরের সময়সীমা ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো কম্পন আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সরকারের বড় পদক্ষেপ: ৪৪৫টি ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চিহ্নিত

ভূমিকম্পের এই বিশাল বিপর্যয় সামাল দিতে এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেছে। জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, ভূমিকম্পসহ নানা নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট ৪৪৫টি ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চিহ্নিত করা হয়েছে।

নগর দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন অঞ্চলে ২৫৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন অঞ্চলে ১৮৯টি স্থানকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানকে সরকারের অনুমোদিত নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করার জন্য প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক ডাটাবেজ ও সরকারের জরুরি পরিকল্পনা

শুধু নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করাই শেষ কথা নয়, দুর্যোগ মুহূর্তে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ পরিচালনা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে সরকার ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করার বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আওতায় থাকা তরুণ ও দক্ষ স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সব স্বেচ্ছাসেবককে একই ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। দুর্যোগের প্রথম মুহূর্তেই যেন এই স্বেচ্ছাসেবকরা উদ্ধারকাজ ও প্রাথমিক চিকিৎসায় নেমে পড়তে পারেন, সেটাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

আপনার এলাকার সম্ভাব্য ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চেনার ৫টি সহজ উপায়

যদিও সরকার এখনো প্রতিটি থানা বা মহল্লাভিত্তিক ৪৪৫টি আশ্রয়স্থলের পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট তালিকা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করেনি, তবে ফায়ার সার্ভিস এবং নগর পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী সম্ভাব্য স্থানগুলো চেনা খুব সহজ। ভূমিকম্পের পর বহুতল ভবন ছেড়ে আপনি যেসব জায়গায় নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেন:

১. উন্মুক্ত খেলার মাঠ

আপনার এলাকার সরকারি বা কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক খেলাধুলার মাঠ হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কারণ সেখানে উঁচু কোনো ভবন বা দেয়াল ধসে পড়ার ভয় থাকে না।

২. পাবলিক পার্ক ও উদ্যান

গাছপালায় ঘেরা শহরের বড় উন্মুক্ত উদ্যান বা পার্কগুলোতে আশ্রয় নিন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন বড় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সীমানা প্রাচীর বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে না দাঁড়ান।

৩. বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোলা প্রাঙ্গণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কিংবা এলাকার বড় সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিশাল খেলার মাঠ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত।

৪. বিস্তীর্ণ খালি জায়গা

যেকোনো বহুতল ভবন, বড় শপিংমল কিংবা বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে অবস্থিত ফাঁকা জায়গা বিপদের সময় সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিন।

৫. সরকারি অনুমোদিত জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে সরকার থেকে প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় তালিকা টানিয়ে দেওয়া হবে। সেই তালিকা দেখে আপনার নিকটস্থ আশ্রয়স্থলটি চিনে রাখুন।

ভূমিকম্প হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও সুরক্ষা টিপস

ভূমিকম্পের আঘাত হানে হঠাৎ করেই, তাই কোনো সংকেত পাওয়া যায় না। তবে কিছু প্রাথমিক নিয়ম মেনে চললে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব:

  • ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন: ঘরের ভেতর থাকলে শক্ত টেবিল বা ডেক্সের নিচে আশ্রয় নিন এবং মজবুত কিছু ধরে রাখুন।
  • লিফট ব্যবহার বন্ধ রাখুন: কম্পনের সময় বা ঠিক পর পরই কখনো লিফট ব্যবহার করবেন না। সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
  • বিদ্যুৎ ও গ্যাস বন্ধ করুন: ঝাঁকুনি থামার সাথে সাথে গ্যাসের চুলা এবং প্রধান বিদ্যুৎ সুইচ বন্ধ করে দিন।
  • জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখুন: ব্যাগে কিছু শুকনা খাবার, পানি, ফার্স্ট এইড কিট, টর্চ লাইট এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের ফটোকপি সবসময় গুছিয়ে রাখুন।

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমাতে পারে। সরকারের ৪৪৫টি নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করার উদ্যোগ একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন সময় নিজেদের সচেতন করার এবং সরকারের নির্দেশিকাগুলো মেনে প্রস্তুত থাকার। আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে আজই জেনে নিন আপনার নিকটতম ফাঁকা মাঠ বা পার্কের অবস্থান।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!