দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ২০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নিরাপত্তা ও সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় যৌথভাবে এই মেগা আয়োজন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, দেশের জনগণ সরাসরি এই নির্বাচনে ভোট দেন না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দিয়ে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রাথমিক প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন থেকে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের নির্দিষ্ট কক্ষে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকারের সভাপতিত্বে এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তা, সংসদ সচিবালয়ের উর্ধ্বতন প্রতিনিধি, সরকারদলীয় চিফ হুইপ এবং বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন থাকে, সে বিষয়ে বৈঠকে একমত প্রকাশ করা হয়।
মনোনয়নপত্র দাখিল ও প্রত্যাহারের নিয়ম
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচন ঘোষণার পর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে হয়।
- মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়: ১৮ আগস্ট।
- মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার: ১৮ আগস্টের মধ্যেই প্রার্থীতা যাচাই এবং ইচ্ছুক প্রার্থীরা তাদের নাম প্রত্যাহার করে নিতে পারবেন।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং নির্ধারিত দিনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ভোটগ্রহণ পদ্ধতি: সংসদ সদস্যরা যেভাবে ভোট দেবেন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেভাবে সাধারণ মানুষ ভোট দেয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটদানের নিয়মটি কিছুটা ভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম ভোটদানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপনীয় ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে।
১. ভোটারদের তালিকা ও যোগ্যতা
চলতি সংসদে বর্তমানে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এই ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
২. আসন নম্বর অনুযায়ী ভোট দান
ভোট দেওয়ার সুবিধার্থে সংসদ সদস্যদের তাদের নির্দিষ্ট আসন নম্বর বা ‘রোল’ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ভোটকেন্দ্রে ডেকে নেওয়া হবে। সদস্যরা নির্ধারিত বুথে গিয়ে ব্যালট পেপার গ্রহণ করবেন।
৩. প্রার্থীর নাম লিখে ভোট প্রদান
ব্যালট পেপারে প্রার্থীদের নাম থাকবে। সংসদ সদস্যরা যে প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, গোপনীয় বুথে গিয়ে সেই প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত নিয়মে ভোট দেবেন অথবা প্রার্থীর নাম লিখে সমর্থন জানাবেন। ভোট দেওয়া শেষে মুখবন্ধ ব্যালট পেপারটি নির্দিষ্ট ব্যালট বাক্সে ফেলবেন।
৪. ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোটার বা তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স খোলা হবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার সব ভোট গণনা করবেন। ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরপরই জাতীয় সংসদ ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ ও বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া ও দলের অবস্থান
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শীর্ষ দলগুলোর প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিশেষ কৌশল।
সরকারি দলের প্রার্থী নির্বাচন
নির্বাচন নিয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ জানান, তাদের রাজনৈতিক দল থেকে এখনও পর্যন্ত একক কোনো প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি। দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী নির্বাচনের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানকে। তিনি জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং সুবিধাজনক সময়ে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবেন।
বিরোধী দলের অবস্থান
চিফ হুইপ আরও জানান, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল থেকেও প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেওয়া হলে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় রূপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতেই বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে নিয়ে যৌথ বৈঠক করা হয়েছে।
নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও দেশের সার্বিক পরিবেশ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি দেশের শীর্ষ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। তাই এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেবল জাতীয় সংসদেই নয়, সারা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে, ২০ আগস্টের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতার সাথেই পরিচালিত হবে। সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণের দিন সংসদ ভবনের ভেতরে ও বাইরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে, যাতে ভোটগ্রহণ চলাকালীন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হতে পারে।








