আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) আলোচিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। এই মামলার অন্যতম আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ও চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম যুক্তিতর্কের শেষ পর্যায়ে দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানান ট্রাইব্যুনালের কাছে।
তাজুল ইসলাম বলেন,
“এই মামলায় প্রমাণিত হয়েছে যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বে সেই সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। তাঁরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালান।”
তিনি আরও জানান, তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, এই দুই আসামি সংগঠিত অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও নীতিনির্ধারক ছিলেন। তাদের ভূমিকা রাষ্ট্রের মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়েছে।
তৃতীয় আসামির ভূমিকা
এই মামলার আরেক আসামি ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন। তবে তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে ট্রাইব্যুনালের কাছে রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন,
“আমরা মনে করি, সাবেক আইজিপি মামুন তার জবানবন্দিতে ঘটনার পূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রতি কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার বিষয়।”
তদন্ত দল বলছে, মামুনের সাক্ষ্য-জবানবন্দি মামলার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কারণ তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ
আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আদালতের অনুমতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আবেদন দাখিল করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের ওপর যেসব হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়ন চালায়, সেসবের দায় সরাসরি এই দুই শীর্ষ নেতার ওপর বর্তায়।
তারা দাবি করে, এই অপরাধগুলো মানবতার বিরুদ্ধে, তাই ট্রাইব্যুনালের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে।
আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা
পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের পক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন আদালতের কাছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য এক সপ্তাহ সময় চান।
ট্রাইব্যুনাল তাঁর এই আবেদন মঞ্জুর করে আগামী সোমবার থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার এর নেতৃত্বে আরও দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এই মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
মামলার পটভূমি
জুলাই মাসে সংঘটিত ওই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের কয়েকটি জেলায় প্রশাসনিক দমন-নীতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস অভিযানে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মতে, ওই সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রকৃতি ও পরিসর মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
তদন্তে উঠে এসেছে, তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বসে এসব অভিযানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণে এসব তথ্য সমর্থিত হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে।
প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী ধাপ
চিফ প্রসিকিউটরের এই আবেদনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
অন্যদিকে আসামিদের আইনজীবীরা বলছেন, তারা আদালতে যথাযথভাবে তাদের পক্ষ উপস্থাপন করবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়বেন।
ট্রাইব্যুনাল আগামী সপ্তাহে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় নেবে বলে জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রয়োজন। রাজসাক্ষীর স্বীকারোক্তি মামলার গতি পরিবর্তন করতে পারে, তবে আদালতকে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। এই মামলার রায় বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।








