বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ঘুমের কোনো দেখা নেই? কিংবা মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর চোখের পাতা এক হচ্ছে না? এই পরিচিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমরা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অবশ্যই হয়েছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় টানা এই ঘুম না আসার নাম ‘ইনসমনিয়া’ বা অনিদ্রা।
অনিদ্রার পেছনে মানসিক দুশ্চিন্তা, বার্ধক্যজনিত সমস্যা, হরমোনের পরিবর্তন, নৈশকালীন ডিউটি কিংবা শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু রাতে যখন ঘুম আসে না, তখন আমাদের ভুল কিছু আচরণের কারণেই সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ব্রিটেনে কর্মরত বিশিষ্ট ঘুম বিশেষজ্ঞদের (Sleeep Specialists) মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে চলুন জেনে নেওয়া যাক রাতে ঘুম না আসলে কোন কাজগুলো একদম করা যাবে না এবং কীভাবে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সম্ভব।
১. জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না
অনেকে ঘুম না আসলেও চোখ বন্ধ করে শক্ত হয়ে শুয়ে থাকেন এবং ঘুমানোর জন্য মনে মনে জোর চেষ্টা চালান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অনিদ্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক কলিন ইসপির মতে, মানব মস্তিষ্কে জোর করে কখনো ঘুম আনা যায় না। যখনই আপনি ঘুমানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করবেন, মস্তিষ্ক সেটাকে এক ধরনের উত্তেজনা বা ‘হুমকি’ হিসেবে গ্রহণ করবে। ফলে শরীর আরও বেশি জেগে উঠবে। তাই ঘুম না আসলে জোর না করে স্বাভাবিক থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মস্তিষ্ককে শান্ত হতে দেওয়া সবচেয়ে উত্তম কাজ।
২. বিছানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থাকবেন না
বিছানায় শুয়ে থেকে ঘুমানোর জন্য যুদ্ধ করা অনুচিত। চিকিৎসকদের মতে, ২০ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি সময় বিছানায় শুয়ে থাকার পরও যদি ঘুম না আসে, তবে অবিলম্বে বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়া উচিত।
লন্ডনের রয়াল ব্রম্পটন হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালি হায়ার বলেন, ঘুম না আসলে অন্য ঘরে বা অন্য স্থানে চলে যান। আলো কমিয়ে বই পড়ুন বা শান্ত সৃষ্ট কোনো কাজ করুন। যখন পুনরায় ক্লান্তি অনুভব করবেন, তখন আবার বিছানায় ফিরুন। এটি আপনার মস্তিষ্কের জন্য একটি ‘রিবুট সিস্টেম’ বা নতুন সূচনার মতো কাজ করে।
৩. রাতে অতিরিক্ত মোবাইল বা উত্তেজক স্ক্রিন দেখা থেকে বিরত থাকুন
ঘুমানোর আগে বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া বা টেলিভিশন চালানো অত্যন্ত ক্ষতিকর অভ্যাস।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ড. ফেইথ অর্চার্ডের মতে, স্ক্রিন থেকে আসা উজ্জ্বল আলো এবং তাতে দেখানো রোমাঞ্চকর বা উত্তেজনাকর কনটেন্ট মস্তিষ্ককে সজাগ করে তোলে। স্ক্রিনে যদি এমন কিছু দেখা হয় যা মনকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা উত্তেজিত করে, তবে ঘুম বহুদূরে পালিয়ে যাবে। তাই রাতের বেলায় যেকোনো ডিভাইসের ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ বা অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লিমেন্ট খাবেন না
ঘুম আসছে না বলেই চট করে কোনো ঘুমের ওষুধ (Sleeping Pill) খেয়ে নেওয়া মারাত্মক ভুল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কগনেটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) বা আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষের অনিদ্রা স্থায়ীভাবে নিরাময় হয়।
তাছাড়া মেলাটোনিন বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো সাপ্লিমেন্টগুলো সবার ক্ষেত্রে কার্যকর বলে বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ প্রমাণিত নয়। তাই কোনো ধরনের ওষুধ খাওয়া বা ভুল অভ্যাস গড়ে তোলা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
৫. সোফা বা কাজের টেবিলে ঘুমানোর মানসিকতা এড়িয়ে চলুন
কাজের টেবিলে, সোফায় বা টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া কিংবা বিছানায় বসে অফিশিয়াল কাজ করা দুটোই ঘুমের সুনির্দিষ্ট চক্রকে নষ্ট করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, আপনার মস্তিষ্ককে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দিন যে ‘বিছানা কেবল ঘুমের জন্যই’। বিছানায় বসে ল্যাপটপ চালানো, কাজ করা কিংবা খাবার খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিলে মস্তিষ্কে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছায়, যা দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।
স্বাভাবিক ঘুম নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
অনিদ্রার সমস্যা দূর করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে বেশ কয়েকটি সহজ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা:
- নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা: প্রতিদিন একই সময়ে শুতে যাওয়া এবং সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার কঠোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- স্লিপ রেস্ট্রিকশন থেরাপি: প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় বিছানায় না কাটিয়ে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখুন। সকালে দ্রুত ঘুম থেকে উঠলে রাতে নিজে থেকেই গভীর ঘুম আসবে।
- মানসিক দুশ্চিন্তা কমানো: শোয়ার আগে মন শান্ত রাখতে হালকা কোনো বই পড়ুন অথবা মৃদু শান্ত সংগীত শুনতে পারেন।
- পার্টনারের নাসিকা গর্জন বা অস্বস্তি: যদি সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে ঘুম না আসে, তবে সাময়িকভাবে অন্য ঘরে ঘুমানো বা ‘স্লিপ ডিভোর্স’ পদ্ধতি বেছে নেওয়া যৌক্তিক।
- অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন ত্যাগ: রাতে ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল, চা বা কফি পান করা বন্ধ করুন। অ্যালকোহল আপনার গভীর ঘুমের চক্রকে পুরোপুরি বিনষ্ট করে দেয়।
কখন চিকিৎসকের নিকট যাবেন?
যদি আপনার এই ঘুম না আসার সমস্যা সপ্তাহে অন্তত তিন রাত করে একটানা তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে এবং এর ফলে দিনের কর্মক্ষমতা বিঘ্নিত হয়, তবে সেটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘমেয়াদী ‘ইনসমনিয়া’ হিসেবে ধরা হয়। এই অবস্থায় নিজের মনমতো ওষুধ বা ভুল টোটকা ব্যবহার না করে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
সঠিক সময় ঘুম না হওয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলে। তাই বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিত এসব ছোটখাটো সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই রাতের অনিদ্রা কাটিয়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবনের পথে ফিরে আসা সম্ভব।








