হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হলো মুজিবের 'বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা' উপাধি: যুক্ত...
spot_img

পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হলো মুজিবের ‘বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা’ উপাধি: যুক্ত হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস ও জিয়াউর রহমান

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করেছে। সেই পরিবর্তনের হাওয়া এবার লেগেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা পাঠ্যপুস্তকের বয়ানে আসছে আমূল পরিবর্তন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য যে নতুন পাঠ্যবই প্রস্তুত করেছে, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’র মতো উপাধিগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পাঠ্যবইয়ে যে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা হতো, তা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জুলাই বিপ্লব, শেখ হাসিনার পলায়ন, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং খালেদা জিয়ার শাসনকাল।

পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিমার্জন: কী কী বাদ যাচ্ছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনায় এনসিটিবি পাঠ্যবই সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বইগুলোতে বড় ধরনের কাঁটাছেড়া করা হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্তরের বইগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি আর ব্যবহার করা হচ্ছে না।

বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় ৭ই মার্চের ভাষণের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হলেও তার আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি নেই। গত বছর বা তার আগের সংস্করণগুলোতে এই একই টেক্সটে অন্তত ৫ জায়গায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি লেখা ছিল। কিন্তু নতুন সংস্করণে সেখানে শুধুই ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লেখা হয়েছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে লিখিত নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে যেখানে আগে ‘জাতির পিতা’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ লেখা ছিল, সেগুলো সম্পাদনা করে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায়, যেমন ‘শিক্ষার্থীদের কাজ’ অংশে হয়তো ভুলবশত এখনো শব্দটি রয়ে গেছে, যা পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নতুন করে যুক্ত হলো জুলাই বিপ্লব ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী অধ্যায়

বিগত সরকারগুলোর আমলে পাঠ্যবইয়ে সমসাময়িক অনেক রাজনৈতিক ঘটনা চেপে যাওয়া হতো বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এই অধ্যায়টিকে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা এখন বইয়ের পাতায় পড়তে পারবে কীভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। বইটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের ‘বাকশাল’ গঠন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসন হিসেবে উল্লেখ করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যগুলো শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়েছে নতুন কারিকুলামে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনকালের অন্তর্ভুক্তি

গত দেড় যুগে পাঠ্যবই থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনেকটাই মুছে ফেলা হয়েছিল। তবে নতুন সংস্করণে ইতিহাসের এই গ্যাপ পূরণ করা হয়েছে।

বইটিতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর বিষয়টি বিস্তারিতভাবে স্থান পেয়েছে। একনায়কতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে জিয়াউর রহমান দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন, তা শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে। এছাড়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসন এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের কথাও বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ চিত্র পাবে বলে আশা করছেন শিক্ষাবিদরা।

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও তথ্য

পাঠ্যবই থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্যতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। দীর্ঘ দিন ধরে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, ঐতিহাসিক দলিলাদি বলছে ভিন্ন কথা। এই উপাধিটি নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তাও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

গবেষকদের মতে, বাংলায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক আগেই আরেকজন মনীষী পেয়েছিলেন। ২০০১ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এক গবেষণায় উঠে আসে যে, আজ থেকে প্রায় ৭৮ বছর আগেই সমাজ সংস্কারক মুন্সী মেহেরুল্লাহ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

মুন্সী মেহেরুল্লাহ ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক, ধর্মপ্রচারক ও সাহিত্যিক। ১৮৬১ সালে যশোরে জন্মগ্রহণকারী এই মহান ব্যক্তি তৎকালীন সমাজে খ্রিস্টান মিশনারিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজের সংস্কারে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মির্জা ইউসুফ আলী তাকে প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকাভিত্তিক সাহিত্য সংগঠন ‘প্রেক্ষণ’ ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত এক স্মরণিকায় এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছিল।

অর্থাৎ, ইতিহাস বলছে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি একচেটিয়াভাবে কারো নয়, বরং এর ঐতিহাসিক দাবিদার মুন্সী মেহেরুল্লাহ। নতুন পাঠ্যবই প্রণয়নের ক্ষেত্রে হয়তো এই ঐতিহাসিক সত্যতাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবি ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, তারা জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বইগুলোতে পরিবর্তন এনেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক বিশেষজ্ঞ জানান, “বইয়ের কনটেন্টে সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং পৌরনীতি বইয়ে শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে।”

ইতিমধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষের বইগুলোর অনলাইন ভার্সন ওয়েবসাইটে আপলোড করা শুরু হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীরা যাতে বছরের শুরুতেই বই হাতে পায় বা পড়তে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে এনসিটিবি।

নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন ইতিহাস

পাঠ্যবই যেকোনো জাতির শিক্ষার মেরুদণ্ড। সেখানে যদি ভুল বা একপাক্ষিক ইতিহাস থাকে, তবে পুরো একটি প্রজন্ম ভুল জেনে বড় হয়। ২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা নিয়ে হয়তো রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। কিন্তু জুলাই বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের অবদান এবং শেখ হাসিনার পলায়নের মতো ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে ইতিহাসের সত্য তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আগামী দিনের শিক্ষার্থীরা যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায় এবং প্রকৃত ইতিহাস জেনে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!