বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী ১২ই জানুয়ারি তিনি ঢাকায় পা রাখবেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে তার এই আগমনকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্টের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র পেশ করার পরপরই তিনি তার কাজ শুরু করবেন। জানা গেছে, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের যোগদান নিয়ে ইতিমধ্যেই সরকারি দপ্তর এবং মার্কিন দূতাবাসের মধ্যে জোর প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনের ঠিক আগেই ঢাকায় নতুন মিশন
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত শিডিউল অনুযায়ী ইতিমধ্যেই প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের কাজ শেষ হয়েছে। ঠিক এমন একটি সময়ে ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকায় পা রাখার পরপরই নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হবে তাকে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের পরিবেশ বোঝা তার জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। যেহেতু তিনি নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে আসছেন, তাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীল সমাজের নজর থাকবে তার কার্যক্রমের ওপর।
কে এই ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন?
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুব একটা অপরিচিত মুখ নন। তিনি এর আগেও ঢাকায় কাজ করে গেছেন। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতি সম্পর্কে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ডিসেম্বরে মার্কিন সিনেট তাকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। লিংকডইনে এক পোস্টে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন লিখেছেন, “মার্কিন সিনেটের অনুমোদন পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। বাংলাদেশে পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”
পিটার হাসের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তদশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন পিটার হাস। ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন এবং গত বছরের ২৭শে সেপ্টেম্বর অবসরে যান। পিটার হাসের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ট্রেসি অ্যান্ড জ্যাকবসন দূতাবাসের ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। এখন সেই পদে স্থায়ীভাবে স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কী আছে?
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন একজন অভিজ্ঞ পেশাদার কূটনীতিক। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। সেখানে তিনি বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিরোধ মিশনের আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে কাজ করতেন।
তার দুই দশকেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে কাজ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- ম্যানিলা (ফিলিপাইন)
- সান সালভাদর
- রিয়াদ (সৌদি আরব)
- হো চি মিন সিটি (ভিয়েতনাম)
এছাড়া তিনি মার্কিন রাজনৈতিক-সামরিক ব্যুরোর উপ-পরিচালক এবং উত্তর কোরিয়া নীতির জন্য বিশেষ সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তিনি বেশ উজ্জ্বল। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে মাস্টার্স এবং রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনায় তার ডিগ্রি রয়েছে। ইংরেজি ছাড়াও তিনি স্প্যানিশ, জার্মান, ভিয়েলনামি, ফরাসি, জাপানি ও পর্তুগিজ ভাষায় দক্ষ।
বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
সিনেটের শুনানিতে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বড় প্রতিবেশীদের ছায়ায় থাকায় বাংলাদেশ অনেক সময় যথাযথ আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায় না।
তিনি আরও বলেন, “ফরেন সার্ভিসে আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ নীতি নিয়ে কাজের সুযোগ হয়েছে। আমি দেশটির গুরুত্ব এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিষয়টি ভালোমতো বুঝি। কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি অবাধ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
চীন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ভাবনা
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তার শুনানিতে চীন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজের ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই বিষয়গুলো বোঝাতে তিনি বাংলাদেশ সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ ১৫ বছর শাসনকারী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ এখন একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী নির্বাচন দেশটির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক উন্নতি, বাণিজ্যের বাধা কমানো এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে কাজ করব।”
নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে অভিজ্ঞ এই কূটনীতিকের আগমন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কোনো মোড় নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








