নতুন কোনো জায়গায় প্রথম রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কম-বেশি রয়েছে। ভ্রমণে গিয়ে সুন্দর হোটেলে থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না। আবার ঘুম এলেও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাজের সূত্রে ঘন ঘন ভ্রমণ করেন রবিনসন লিওনি। তিনি জানান, নিজ বাড়িতে প্রতিদিন গড়ে সাত ঘণ্টা ঘুমালেও ভ্রমণের প্রথম রাতে তিনি ৫ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারেন না। মনে কোনো ভয় বা চিন্তা না থাকলেও অচেনা পরিবেশে তাঁর এই সমস্যা হয়।
আপনিও কি নতুন জায়গায় গেলে এই সমস্যায় পড়েন? বিজ্ঞান কিন্তু বলছে, এই অনিদ্রা একেবারেই স্বাভাবিক।
বিজ্ঞানের চোখে ‘ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট’ কি?
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিত ঘরের বাইরে গিয়ে এই যে ঘুমাতে না পারা বা ঘুম পাতলা হওয়া এর একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট’ (First-Night Effect) বা প্রথম রাতের প্রভাব।
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবার্গের জ্যেষ্ঠ ঘুম গবেষক অ্যানা উইক জানান, বিবর্তনগত কারণেই মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে। অচেনা পরিবেশে কোনো সম্ভাব্য বিপদ আছে কি না, তা নিয়ে মস্তিষ্ক চিন্তিত থাকে। ফলে রাতে শরীর ঘুমালেও মস্তিষ্কের একটি অংশ সার্বক্ষণিক জাগ্রত বা সতর্ক থাকে।
সমুদ্রের ডলফিন যেমন সাঁতার কাটার সময় মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ জাগিয়ে রাখে, মানুষের ক্ষেত্রে পুরোটা না হলেও মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট একটি অংশ নতুন জায়গায় এভাবেই সতর্ক পাহারায় থাকে।
অনিদ্রার পেছনে আরও যত বৈজ্ঞানিক কারণ
পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ ইউনিভার্সিটির ঘুম গবেষক আহমাদ মেয়েলি জানান, নতুন পরিবেশে গেলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ঘুম প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত কমে যায়।
- মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সক্রিয় থাকা: গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর ঘুমের সাথে জড়িত মস্তিষ্কের ‘ফ্রন্টাল লোব’ অংশটি অচেনা জায়গায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।
- বয়সের প্রভাব: বিশের কোঠায় থাকা তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে এই ফার্স্ট-নাইট ইফেক্টের প্রভাব সবচেয়ে কম দেখা যায়। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে নতুন পরিবেশে ঘুমানোর এই সমস্যাটি আরও বাড়তে থাকে।
- পরিবেশগত পরিবর্তন: ঘুম বিশেষজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিক লিসা স্ট্রস বলেন, কেবল মস্তিষ্কের সতর্কতাই নয়; ভ্রমণের শারীরিক ক্লান্তি, নতুন ঘরের পরিবেশ (যেমন হোটেলের ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র বা স্মোক ডিটেক্টরের লাইট, অপরিচিত শব্দ বা এসি-র তাপমাত্রা) ঘুম নষ্ট করে।
- মানসিক দুশ্চিন্তা: যাদের আগে থেকেই দুশ্চিন্তা করার প্রবণতা রয়েছে, তারা বিছানায় শুয়ে ‘আজ রাতে ঘুম আসবে তো?’ এমন চিন্তা করতে করতেই রাত পার করে দেন।
নতুন জায়গায় সহজে ঘুমানোর ৫টি সহজ সমাধান
প্রথম রাতের অনিদ্রা থেকে মুক্তি পেতে এবং নতুন পরিবেশেও শান্তিতে ঘুমাতে ঘুম বিশেষজ্ঞরা কিছু চমৎকার ও কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন:
- নিজের পরিচিত জিনিস সাথে রাখা: ভ্রমণে যাওয়ার সময় নিজের নিয়মিত ব্যবহার করা বালিশ, পাতলা কম্বল বা পরিচিত সুবাসের কিছু সাথে রাখুন। এতে পরিবেশটি মস্তিষ্কের কাছে অচেনা মনে হবে না।
- বিছানার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া: হোটেলে বা নতুন ঘরে পৌঁছেই সাথে সাথে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না। বরং শোবার আগে কিছুক্ষণ বই পড়ুন বা হালকা কোনো কাজ করে বিছানাটির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিন।
- নিয়ম ও পরিবেশ বজায় রাখা: ভ্রমণের আগের ও পরের ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় মেনে চলুন। ঘর পর্যাপ্ত ঠান্ডা ও অন্ধকার রাখুন। শোবার অন্তত আধঘণ্টা আগে মোবাইল ও টিভির স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করুন।
- মনস্তাত্ত্বিক চর্চা ও রিল্যাক্সেশন: শুয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিজের প্রিয় বা নিরাপদ কোনো সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ কল্পনা করুন। নিজেকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করুন যে আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন।
- গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে একদিন আগে পৌঁছানো: এক রাতের কম ঘুম শরীরের বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে না। তবে পরদিন যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বা ইন্টারভিউ থাকে, তবে একদিন আগেই সেই স্থানে পৌঁছে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শরীর ও মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়।








