রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জুলুম আর দমন-পীড়ন অনেক সময় নেতাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। কিন্তু ইতিহাসের চাকা যখন ঘোরে, তখন সেই নির্বাসিত নেতারাই আবার বীরের বেশে ফিরে আসেন নিজ মাতৃভূমিতে। কেউ দীর্ঘ এক যুগ পর, কেউবা দুই দশক পর বিদেশের মাটি ছেড়ে দেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বসেন রাষ্ট্রক্ষমতায়।
বিশ্ব রাজনীতিতে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে শাসকের তলোয়ারের চেয়ে জনগণের ভালোবাসা শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া সেই ইতিহাসেরই একটি নতুন অধ্যায়।
তারেক রহমান: ১৭ বছরের নির্বাসন ও লড়াকু প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন তারেক রহমান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার যেমন চড়াই-উতরাইয়ে ভরা, তেমনি তার ফিরে আসাটাও ছিল অভাবনীয়।
১. বন্দিত্ব ও অমানবিক নির্যাতন
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডের নামে তার ওপর চালানো হয় অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ২০০৮ সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান চিকিৎসার জন্য।
২. লন্ডনে দীর্ঘ প্রবাস জীবন
পরবর্তী ১৭ বছর তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দেয় এবং তাকে দেশে ফিরতে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু সুদূর প্রবাসে থেকেও তিনি বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি দলকে সুসংগঠিত করে রাখেন।
৩. চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও বিজয়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে তাকে স্বাগত জানাতে। এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি: ইসলামী বিপ্লবের মহানায়ক
ইরানের ইতিহাসে আয়াতুল্লাহ খোমেনি এক অবিস্মরণীয় নাম। তৎকালীন শাহ সরকারের শ্বেত বিপ্লবের বিরোধিতা করায় তাকে ১৯৬৪ সালে তুরস্ক ও পরে ইরাকে নির্বাসিত করা হয়।
- ১৪ বছরের নির্বাসন: তিনি তুরস্ক, ইরাক এবং সবশেষে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটান।
- বিপ্লবের ডাক: প্রবাসে থেকেই তিনি ক্যাসেট ও বার্তার মাধ্যমে ইরানি জনগণের কাছে বিপ্লবের মন্ত্র পৌঁছে দেন।
- বীরের বেশে ফেরা: ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ফ্রান্সে থেকে ইরানে ফেরেন। তার প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই শাহের পতন ঘটে এবং ইরান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। তিনি হন দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা।
বেনজির ভুট্টো: মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
পাকিস্তানের রাজনীতির ‘ডটার অব ডেসটিনি’ বলা হয় বেনজির ভুট্টোকে। তার বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসির পর তিনি পাকিস্তানের কণ্টকাকীর্ণ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
প্রবাস জীবন ও সংগ্রাম
সামরিক শাসক জিয়া-উল-হকের রোষানল থেকে বাঁচতে তিনি ১৯৮৪ সালে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৮৬ সালে তিনি যখন পাকিস্তানে ফেরেন, তখন লাহোরের রাস্তায় তাকে স্বাগত জানাতে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছিল।
দুইবারের প্রধানমন্ত্রী
১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও তাকে বারবার বরখাস্ত করা হয়েছে এবং নির্বাসনে যেতে হয়েছে, প্রতিবারই তিনি জনগণের রায় নিয়ে বীরদর্পে ফিরে এসেছেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা: অন্তরীণ থেকে প্রেসিডেন্ট
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা আক্ষরিক অর্থে দেশের বাইরে না গেলেও, নিজ দেশেই তিনি ২৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। এই দীর্ঘ বন্দিত্ব ছিল এক প্রকার রাজনৈতিক নির্বাসন।
- মুক্তি ও ক্ষমতা: ১৯৯০ সালে কারামুক্তির পর তিনি বিশ্বজুড়ে অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।
- প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট: ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার এই প্রত্যাবর্তন ছিল শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবসানের প্রতীক।
ইতিহাসের আরও কিছু সাহসী প্রত্যাবর্তন
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নির্বাসন বা বন্দিত্ব কোনো নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে না যদি তার সঙ্গে জনসমর্থন থাকে।
- ভ্লাদিমির লেনিন: ১৯১৭ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন করেন।
- চার্লস ডি গল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে নির্বাসিত থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করার ডাক দেন এবং পরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হন।
- অং সান সু চি: দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ক্ষমতা হারানো বা নির্বাসনে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্বাসন একজন নেতাকে আরও পরিপক্ক এবং জনগণের কাছে আরও প্রিয় করে তোলে। তারেক রহমান থেকে শুরু করে আয়াতুল্লাহ খোমেনি কিংবা বেনজির ভুট্টো সবার গল্পই আমাদের শেখায় যে, ধৈর্য এবং সাহসের সঙ্গে লড়াই করলে একদিন সত্যের জয় নিশ্চিত। এই রাজসিক প্রত্যাবর্তনগুলোই বিশ্ব রাজনীতির সৌন্দর্য।
সূত্র: উইকিপিডিয়া ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল।








