বাংলাদেশের রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সবখানেই এখন কিছু নির্দিষ্ট শব্দের জয়জয়কার। ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘বয়ান’, ‘বন্দোবস্ত’ এই শব্দগুলো এখন টকশো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সমাবেশে নিয়মিত শোনা যাচ্ছে। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই শব্দগুলোর ব্যবহার এতই বেড়েছে যে, এটি এখন রীতিমতো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
কেউ বলছেন এগুলো ভাষার সমৃদ্ধি, আবার কেউ বলছেন এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। কেন এই বিতর্ক? চলুন গভীরে যাওয়া যাক।
আলোচনার কেন্দ্রে যেসব শব্দ
সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে বেশ কিছু শব্দ জনপরিসরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে:
- ইনকিলাব: যার অর্থ বিপ্লব। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি এখন নতুন করে শোনা যাচ্ছে।
- আজাদি: স্বাধীনতা শব্দের বিকল্প হিসেবে অনেকে এটি ব্যবহার করছেন।
- নয়া বন্দোবস্ত: রাষ্ট্র সংস্কার বা নতুন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করছেন অভ্যুত্থানের নেতারা।
- ইনসাফ ও মজলুম: বিচার এবং নিপীড়িত বোঝাতে এই আরবি-ফারসি শব্দগুলোর প্রয়োগ বেড়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া
এই শব্দগুলো নিয়ে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট।
১. আপত্তির কারণ কী?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সরাসরি এই শব্দগুলোর বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, “বাংলা ভাষাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক নেই।” অনেকেই মনে করছেন, প্রচলিত ‘বিপ্লব’ বা ‘স্বাধীনতা’ শব্দ থাকতে এই ভিনদেশি শব্দগুলোর ব্যবহার ভাষার বিকৃতি ঘটাতে পারে।
২. সমর্থনের যুক্তি
অন্যদিকে, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তার পোস্টে ‘ইনসাফ’ ও ‘ইনকিলাব’ শব্দগুলো ব্যবহার করে আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মনে করেন, ভাষা কোনো বদ্ধ কুঠুরি নয়। রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য যখন যে শব্দ সহজ মনে হবে, সেটাই ব্যবহৃত হবে।
ভাষাবিদরা কী বলছেন? এটি কি ভাষার জন্য হুমকি?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে এই শব্দগুলো কি বাংলা ভাষাকে বদলে দিচ্ছে? ভাষাবিদরা অবশ্য বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন।
- স্বাভাবিক প্রক্রিয়া: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, “এগুলো কোনো বিকৃতি বা হুমকি নয়। বাংলা ভাষায় ইংরেজি, আরবি, ফারসি শব্দ আগে থেকেই মিশে আছে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শব্দগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজন তৈরি না করে।
- সময়ের বিচার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহালির মতে, সময় নিজেই ঠিক করে দেয় কোন শব্দ টিকে থাকবে আর কোনটি হারিয়ে যাবে। ভাষা নদীর মতো প্রবহমান, একে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বা আটকে রাখা সম্ভব নয়।
কেন এই শব্দগুলো এখন সামনে এলো?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:
- বিপ্লবী আবেগ: ১৯ জুলাই বা ৫ আগস্টের আন্দোলনে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এই শব্দগুলো ব্যবহার করে এক ধরনের ‘রেভোলিউশনারি’ ইমেজ তৈরি করেছে।
- সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য: অনেকে মনে করেন, গত ১৫ বছরের প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ান থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন এই শব্দগুলো এক ধরনের ‘বিদ্রোহী’ পরিচয় দেয়।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলোর এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ভাষা মানুষের আবেগের প্রকাশ। বাংলা ভাষা চিরকালই বিভিন্ন ভিনদেশি শব্দকে নিজের করে নিয়েছে। ‘চেয়ার’, ‘টেবিল’ যেমন আজ বাংলার অংশ, তেমনি ‘ইনসাফ’ বা ‘মজলুম’ শব্দগুলোও এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে অপরিচিত নয়। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে ভাষার ব্যবহার যেন সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ঠিক করবেন তারা ‘আজাদি’ বলবেন নাকি ‘স্বাধীনতা’।








