ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পোস্টার বয় এবং রেকর্ড গোলদাতা নেইমার জুনিয়রের বাম হাঁটুতে সফলভাবে আর্থ্রোস্কোপিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (২২ ডিসেম্বর ২০২৫) ব্রাজিলের বেলো হরিজন্তের একটি হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচার করা হয়। নেইমারের বর্তমান ক্লাব সান্তোস এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আর মাত্র ৬ মাস বাকি থাকতেই নেইমারের এই অস্ত্রোপচার ভক্তদের মনে যেমন শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি সফল অস্ত্রোপচারের খবর নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ফুটবল বিশ্বের এই নক্ষত্র এখন দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে মরিয়া।
সান্তোসকে বাঁচিয়ে তবেই অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেইমার
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নেইমার তাঁর শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন। তবে বছরের শেষ দিকে তিনি বাম হাঁটুর মেনিস্কাস ইনজুরিতে পড়েন। ক্লাবের অবনমন (Relegation) এড়াতে তিনি মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ইনজুরি নিয়েই খেলা চালিয়ে যান। মৌসুমের শেষ ৪ ম্যাচে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি সান্তোসকে ব্রাজিলের শীর্ষ লিগে টিকিয়ে রাখতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। লিগ শেষ হওয়ার পরপরই তিনি অস্ত্রোপচার করানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
৩ বছরের দীর্ঘ বিরতির পর শৈশবের ক্লাবে ফিরে নেইমার প্রমাণ করেছেন যে, তিনি ফুরিয়ে যাননি। হাঁটুর প্রচণ্ড ব্যথা উপেক্ষা করে তিনি যেভাবে সান্তোসকে সাহায্য করেছেন, তা ক্লাবটির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অস্ত্রোপচার ও নেইমারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া
সান্তোসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রধান চিকিৎসক ডা. রদ্রিগো লাসমার এই অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন। নেইমারের হাঁটুতে এর আগেও বেশ কয়েকবার অস্ত্রোপচার করেছিলেন এই চিকিৎসক।
- চিকিৎসা পদ্ধতি: নেইমারের হাঁটুর ‘মিডিয়াল মেনিস্কাস’ চোট সারাতে আর্থ্রোস্কোপি করা হয়েছে। এটি মূলত একটি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে করা আধুনিক শল্যচিকিৎসা।
- বর্তমান অবস্থা: ক্লাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অস্ত্রোপচার শতভাগ সফল হয়েছে এবং নেইমার বর্তমানে হাসপাতালেই বিশ্রাম নিচ্ছেন।
- মাঠে ফেরার সময়: চিকিৎসকরা এখনই নির্দিষ্ট কোনো তারিখ না জানালেও ব্রাজিলের জনপ্রিয় মাধ্যম ‘গ্লোবো স্পোর্ট’ জানিয়েছে, নেইমারের প্রাথমিক সুস্থতায় প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ তিনি পুরোদমে অনুশীলনে ফিরতে পারবেন।
কোচ আনচেলত্তির কঠিন শর্ত ও নেইমারের লড়াই
ব্রাজিল জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি আগেভাগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পেতে হলে নেইমারকে অবশ্যই শতভাগ ফিট থাকতে হবে। আনচেলত্তি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “নেইমার একজন গ্রেট খেলোয়াড়, কিন্তু জাতীয় দলে ফেরার জন্য তাকে তার ফিটনেস প্রমাণ করতে হবে।”
২০২৩ সালের পর থেকে ইনজুরির কারণে নেইমার আর জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামতে পারেননি। ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭৯টি গোল করা এই তারকার অনুপস্থিতি গত কয়েক মাসে বড় বড় ম্যাচে টের পেয়েছে সেলেসাওরা। তাই বিশ্বকাপের আগে নেইমারের সুস্থতা কেবল তাঁর একার জন্য নয়, বরং পুরো ব্রাজিল দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কঠিন গ্রুপ ও প্রতিপক্ষ
আগামী ২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। এই বিশ্বকাপে ব্রাজিল ‘সি’ গ্রুপে খেলবে। গ্রুপ পর্বে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষরা মোটেও সহজ নয়:
- মরক্কো: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো বর্তমান ফুটবল বিশ্বে একটি আতঙ্কের নাম।
- স্কটল্যান্ড: ইউরোপীয় ফুটবলের শক্তিশালী এবং গতিশীল এক দল।
- হাইতি: গ্রুপের তুলনামূলক দুর্বল দল হলেও তারা বড় অঘটন ঘটাতে ওস্তাদ।
নেইমার যদি এই গ্রুপ পর্ব থেকেই খেলতে চান, তবে তাঁকে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে।
কেন নেইমার এখনো অপরিহার্য?
অনেকেই মনে করেন নেইমারের বয়স হয়েছে এবং বারবার ইনজুরি তাঁকে থামিয়ে দিচ্ছে। তবে পরিসংখ্যন বলছে ভিন্ন কথা। নেইমার যখন মাঠে থাকেন, তখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চাপে থাকে। ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক এবং গোল করার ক্ষমতায় তিনি এখনো সমসাময়িক অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের চেয়ে এগিয়ে। ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব দলের জন্য বড় টনিক হতে পারে।
ভক্তদের প্রার্থনা ও নেইমারের প্রতিশ্রুতি
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নেইমার ভক্ত এখন তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন। নেইমার নিজেও তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, তিনি ফুটবলকে মিস করছেন এবং খুব দ্রুতই শক্তিশালী হয়ে ফিরবেন। ২০২৬ বিশ্বকাপই সম্ভবত তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে, তাই এই আসরটিকে রাঙাতে নেইমার কোনো কমতি রাখছেন না।








