চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর এস্তাদিও নাসিওনাল হুলিও মার্তিনেজ প্রাদানোসে ইতিহাস গড়েছে মরক্কো।
ফিফা অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে রেকর্ড ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ২–০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে আফ্রিকার দেশ মরক্কো।
মেসিভক্ত জাবিরির ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্স
ফাইনালের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল মরক্কোর তরুণ তারকা ইয়াসির জাবিরির একটি সাক্ষাৎকার। সেখানে সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“রোনালদো না মেসি?”
প্রতিবারই জাবিরির একটাই উত্তর “মেসি!”
এই মেসিভক্তই আজ যেন নিজের আদর্শের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে কাঁদালেন। ফাইনালে তাঁর জোড়া গোলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো মরক্কো।
ম্যাচের সারসংক্ষেপ
- ফলাফল: আর্জেন্টিনা ০–২ মরক্কো
- গোলদাতা: ইয়াসির জাবিরি (১২’, ২৯’)
- স্থান: সান্তিয়াগো, চিলি
টানা ছয় ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠে আসে আর্জেন্টিনা। দিয়েগো প্লাসেন্তের দলকে সবাই ফেবারিট ধরেছিল।
বল দখলে ছিল তাদেরই আধিপত্য, পুরো ম্যাচে ৭৬% পজেশন ও ২০টি শট নিয়েছিল তারা।
কিন্তু ভাগ্য ও বাস্তবতা বলল অন্য কথা।
মরক্কোর রক্ষণভাগ, সংগঠিত খেলা ও দারুণ পাল্টা আক্রমণে একের পর এক বিপদ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার রক্ষণের ঘুম ভাঙিয়ে দেন জাবিরি, ওথমান মাম্মা ও জেসিম ইয়াসিন।
প্রথম গোলেই ম্যাচের ছন্দ বদলে যায়
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল মরক্কো। মাত্র ১২ মিনিটে দারুণ সুযোগ পান ইয়াসির জাবিরি।
আর্জেন্টাইন গোলকিপার সান্তিয়াগো বারবি তাঁকে বক্সের বাইরে ফাউল করলে ফ্রি-কিক পায় মরক্কো।
সেই ফ্রি-কিক থেকেই বাঁ পায়ের জোরালো শটে প্রথম গোল করেন জাবিরি।
দর্শকরা তখনও গ্যালারিতে বসে উল্লাসে মেতে উঠেছেন, এমন সময় ২৯ মিনিটে আবার আঘাত।
ওথমান মাম্মার দুর্দান্ত ক্রস থেকে হেডে জাবিরির দ্বিতীয় গোল, আর্জেন্টিনার জালের নিঃশব্দ কান্না।
আর্জেন্টিনার অপ্রত্যাশিত পরাজয়
ফাইনালে আর্জেন্টিনার অনেক সুযোগ এসেছিল, কিন্তু একটিও কাজে লাগাতে পারেনি।
মরক্কোর রক্ষণ ছিল ইস্পাতের মতো দৃঢ়।
লিওনেল স্কালোনির দেশের এই তরুণরা শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়েছে, কিন্তু মরক্কান ডিফেন্সের দেয়াল ভাঙতে পারেনি কেউ।
শেষ বাঁশি বাজতেই হতাশায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা।
অন্যদিকে মরক্কোর তরুণরা উল্লাসে ফেটে পড়ে, আবেগে কেউ কেঁদেছে, কেউ আবার আনন্দে সিজদায় লুটিয়েছে।
আফ্রিকার ফুটবলে নতুন দিগন্ত
ফিফা অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ মরক্কোর এই জয় কেবল তাদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা। এই প্রথম কোনো আফ্রিকান দেশ অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ জিতল। এই সাফল্য প্রমাণ করে মরক্কোর তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা রাখে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজ হাতে মরক্কোর অধিনায়ক হোসাম ইসাদাকের হাতে ট্রফি তুলে দেন।
মরক্কোর কোচ আবদেলরহিম এল হাউম বলেন, “আমরা মেসিকে ভালোবাসি, কিন্তু ফুটবল একতরফা নয়। আজ মরক্কো প্রমাণ করেছে, স্বপ্নের পেছনে কঠোর পরিশ্রম করলে সবকিছু সম্ভব।”
চিলির স্টেডিয়ামও যেন আজ এক টুকরো মরক্কো ছিল। লাল-সবুজ পতাকা আর “ভিভা মরোকো!” স্লোগানে স্টেডিয়ামের প্রতিটি সেকেন্ড ছিল উৎসবমুখর। মরক্কোর এই বিজয় ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
ইয়াসির জাবিরি: মেসিভক্ত থেকে নায়ক
২২ বছর বয়সী ইয়াসির জাবিরি বর্তমানে খেলছেন পর্তুগিজ ক্লাব ফামালিকাউতে।
ছোটবেলা থেকেই মেসিকে নিজের অনুপ্রেরণা মানতেন তিনি।
আজ ফাইনালে সেই প্রিয় মেসির দেশকেই হারিয়ে নিজের দেশের নায়ক বনে গেলেন।
ম্যাচ শেষে জাবিরি বলেন,
“মেসি আমার প্রিয় খেলোয়াড়, কিন্তু আজ আমি মরক্কোর হয়ে খেলেছি। এই জার্সিই আমার গর্ব।”
তাঁর এই উক্তি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মরক্কোর সমর্থকদের উল্লাস
চিলির স্টেডিয়াম আজ যেন এক টুকরো মরক্কো।
দর্শকসারিতে লাল-সবুজ পতাকা, হাতে ড্রাম, মুখে স্লোগান “ভিভা মরোকো!”
দ্বিতীয় গোলের পর থেকে স্টেডিয়ামের প্রতিটি সেকেন্ড ছিল উৎসবমুখর।
আফ্রিকার এই দেশের জন্য এটি কেবল একটি জয় নয়, এটি এক ইতিহাস, এক গর্বের অধ্যায়।
ফিফা অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ ২০২৫ মরক্কোর জন্য এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
মেসিভক্ত ইয়াসির জাবিরি আজ ফুটবল বিশ্বের নতুন নায়ক।
তিনি দেখিয়ে দিলেন, মেসিকে ভালোবাসা মানেই হার মানা নয়, বরং অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজের দেশকে গর্বিত করা।








