বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, লন্ডনের একটি প্রেস কনফারেন্সে দুই ব্যক্তি ভারত থেকে মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন। তাদের পেছনের ব্যানারে স্পষ্ট লেখা রয়েছে মণিপুরের স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ভিডিওটি দেখার পর অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি সত্যিই মণিপুর ভারত থেকে আলাদা হয়ে গেল?
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ভাইরাল এই তথ্যের সত্যতা এবং ভিডিওটি আসলে কবেকার।
ভাইরাল ভিডিওতে কী দাবি করা হচ্ছে?
ফেসবুক এবং ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ভারতীয় ‘দখলদারিত্বের’ বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ করে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে মণিপুর। অনেক নেটিজেন এটিকে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে শেয়ার করছেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দুজন ব্যক্তি একটি আনুষ্ঠানিক পরিবেশে বসে মণিপুর রাজ্য পরিষদের পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকার গঠনের কথা বলছেন।
অনুসন্ধানে উঠে আসা ভিন্ন চিত্র
বিষয়টি নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অনুসন্ধান চালানো হয়, তখন সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বর্তমান সময়ে মণিপুরে জাতিগত দাঙ্গা এবং অস্থিরতা চললেও, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্বীকৃত খবর কোনো মাধ্যমই দেয়নি।
ভিডিওটি কি সাম্প্রতিক?
না, ভিডিওটি একদমই সাম্প্রতিক নয়। রিভার্স ইমেজ সার্চ এবং ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, এটি ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের একটি ঘটনা। সেই সময় লন্ডনে ইয়াম্বেন বীরেন এবং নারেংবাম সমরজিৎ নামের দুজন ব্যক্তি নিজেদের ‘মণিপুর রাজ্য পরিষদ’-এর প্রতিনিধি দাবি করে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন যে, তারা মণিপুরের মহারাজার প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন এবং একটি ‘প্রবাসী সরকার’ (Government-in-exile) গঠন করছেন।
ব্যানারের তারিখ লক্ষ্য করুন
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি যদি আপনি ভালো করে লক্ষ্য করেন, তবে পেছনের ব্যানারে স্পষ্টভাবে লেখা দেখতে পাবেন “29 October, London”। এই তারিখটি ২০১৯ সালের সেই সংবাদ সম্মেলনের সাথে হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ, ৫ বছর আগের একটি পুরনো ভিডিওকে বর্তমানে নতুন প্রেক্ষাপটে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান মণিপুরের বাস্তব অবস্থা কী?
বাস্তবতা হলো, মণিপুর এখনো ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরাজ্য। আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা যেমন জাতিসংঘ (UN) বা বিশ্বের কোনো দেশ মণিপুরের এই তথাকথিত ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’কে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারত সরকারও সে সময় এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল এবং তাদের দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে মণিপুরে মেইতেই এবং কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে জাতিগত উত্তেজনা চলছে, সেই পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কিছু কুচক্রী মহল এই পুরনো ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়ে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় ভিউ বা ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্যে পুরনো ভিডিওকে নতুন খবর হিসেবে চালানো হয়। মণিপুরের এই ভিডিওটির ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটিই ঘটেছে।
তথ্য যাচাই কেন জরুরি?
অনলাইনে যেকোনো সংবেদনশীল খবর দেখার পর তা বিশ্বাস করার আগে যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। একটি ভুল তথ্য সমাজের শান্তি বিনষ্ট করতে পারে। মণিপুরের স্বাধীনতার মতো বড় কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা অবশ্যই বিবিসি, সিএনএন বা ভারতের নামী সংবাদমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হতো। যেহেতু তেমন কোনো প্রমাণ নেই, তাই এটি নিশ্চিতভাবেই একটি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর খবর।
‘মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা’র খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পুরনো ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০১৯ সালের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, কোনো ভিডিও বা পোস্ট শেয়ার করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করুন।








