হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বুধবার, জুন ১৭, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজীব বৈচিত্রগাছের শরীরে জোনাকির ডিএনএ, এবার বিদ্যুৎ ছাড়াই আলো পাবে পৃথিবী?
spot_img

গাছের শরীরে জোনাকির ডিএনএ, এবার বিদ্যুৎ ছাড়াই আলো পাবে পৃথিবী?

ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে, তা নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের গল্পে বা সিনেমায় আমরা অনেক কিছুই দেখেছি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাস্তার পাশের গাছগুলোই যদি ল্যাম্পপোস্টের মতো আলো ছড়াতে শুরু করে? যা এতদিন মানুষের ভাবনারও অতীত ছিল, ঠিক সেই স্বপ্নকেই এবার বাস্তবে ছুঁয়ে দেখার পথ দেখালেন চীনের একদল জিন বিজ্ঞানী।

গাছের শরীরে জোনাকি পোকার ডিএনএ (DNA) বা জিন প্রতিস্থাপন করে তারা এক অবিশ্বাস্য অসাধ্যসাধন করেছেন। এই প্রযুক্তির ফলে তৈরি হওয়া বিশেষ উদ্ভিদগুলো কোনো প্রকার বিদ্যুৎ ছাড়াই রাতের অন্ধকারকে মৃদু আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম। জিন প্রকৌশল বা বায়োটেকনোলজির এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে গোটা বিশ্বে।

এক নজরে আলো ছড়ানো উদ্ভিদের আবিষ্কার

পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে এই নতুন আবিষ্কারের মূল তথ্যগুলো নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

প্রধান বিষয়বিস্তারিত তথ্য
আবিষ্কারক দেশচীন (China)
প্রধান বিজ্ঞানী ও নেতৃত্বলি রেংহান (প্রতিষ্ঠাতা, ম্যাজিকপেন বায়ো)
ব্যবহৃত প্রযুক্তিজিন প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering)
জিনের উৎসজোনাকি পোকা এবং আলো উৎপাদনকারী বিশেষ ছত্রাক (Mushroom)
গাছের প্রজাতিঅর্কিড, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকাসহ ২০টিরও বেশি প্রজাতি
প্রধান লক্ষ্যবিদ্যুৎ সাশ্রয়, রাত্রিকালীন পর্যটন এবং পরিবেশ দূষণ কমানো

কীভাবে এই অসাধ্যসাধন করলেন বিজ্ঞানীরা?

যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই কাজটি করা হয়েছে, তা সত্যিই চমৎকার। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা মূলত জোনাকি পোকা এবং অন্ধকারে আলো ছড়াতে পারে এমন বিশেষ জাতের ছত্রাকের (Fungi/Mushroom) শরীর থেকে আলো উৎপাদনকারী জিন সংগ্রহ করেছেন।

এরপর ল্যাবরেটরিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই জিন বা ডিএনএ-কে সাধারণ উদ্ভিদের কোষে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। চিনের বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি সংস্থা ‘ম্যাজিকপেন বায়ো’ (Magicpen Bio)-এর প্রতিষ্ঠাতা লি রেংহানের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা অর্কিড, সূর্যমুখী ও চন্দ্রমল্লিকার মতো ২০টিরও বেশি জনপ্রিয় প্রজাতির গাছের শরীরে এই জিন সফলভাবে বসাতে পেরেছেন। ফলে এই গাছগুলো এখন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই অন্ধকারে মৃদু আলো ছড়াতে পারে।

হলিউডের ‘অবতার’ সিনেমার মতো ভবিষ্যতের পৃথিবী!

বিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় সৃষ্টি দেখে অনেকেই ভবিষ্যতের পৃথিবীকে জেমস ক্যামেরনের বিখ্যাত হলিউড সিনেমা ‘অবতার’ (Avatar)-এর প্যান্ডোরা গ্রহের সাথে তুলনা করছেন। যেখানে রাতের বেলা বনের প্রতিটি গাছপালা ও ফুল লুমিনেসেন্ট বা প্রাকৃতিকভাবে জ্বলজ্বল করে ওঠে।

প্রধান বিজ্ঞানী লি রেংহান জানিয়েছেন, মূলত পর্যটন খাত এবং রাতের শহরের অর্থনীতিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার কথা ভেবেই তারা এই গবেষণা চালিয়েছেন। এই গাছগুলো যখন পার্ক বা রাস্তার পাশে বড় আকারে লাগানো হবে, তখন পুরো এলাকা এক মায়াবী আলোয় ভরে উঠবে, যা দেখতে ঠিক ভিনগ্রহের মতোই মনে হবে।

লাইট বায়ো এবং ২০২৪ সালের ‘ফায়ারফ্লাই পেটুনিয়া’

অন্ধকারে আলো ছড়ানো গাছের ধারণা কিন্তু একবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালে ‘লাইট বায়ো’ (Light Bio) নামের একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফায়ারফ্লাই পেটুনিয়া’ (Firefly Petunia) নামক একটি ফুল গাছ বাজারে বিক্রি করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তবে সেই গাছ তৈরিতে কেবল আলো ছড়ানো মাশরুমের ডিএনএ ব্যবহার করা হয়েছিল এবং আলোর পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত।

কিন্তু এবার চীনা বিজ্ঞানীরা জোনাকির জিন ব্যবহার করে আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। তারা একসাথে ২০টিরও বেশি প্রজাতির বড় গাছ তৈরি করেছেন। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, এই গাছগুলো ঘরের কোণ বা পার্কের একটি বড় অংশকে ল্যাম্পপোস্ট ছাড়াই চমৎকারভাবে আলোকিত করে রাখতে পারবে।

পরিবেশ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এই আবিষ্কারের ভূমিকা

এই আবিষ্কার শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই নয়, বরং পরিবেশের সুরক্ষায় এটি একটি বড় মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন চীনা বিজ্ঞানীরা।

  • বিদ্যুৎ সাশ্রয়: রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট বা পার্কের আলো জ্বালাতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, এই গাছগুলো থাকলে তার আর দরকার পড়বে না।
  • জালানি রক্ষা: বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়, তা অনেকাংশে কমে যাবে।
  • কার্বন নির্গমন হ্রাস: জ্বালানি ব্যবহার কমলে বাতাসে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমনও ঠেকানো সম্ভব হবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং কমাতে সাহায্য করবে।

প্রকৃতির সবুজকে অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে বিজ্ঞানের সাহায্যে তাকে আরও কার্যকর করা যায়, চিনের বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার তারই এক অনন্য উদাহরণ। যদি বাণিজ্যিকভাবে এই গাছগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে খুব শীঘ্রই হয়তো আমরা এক সবুজ অথচ আলোয় ঘেরা নতুন পৃথিবীর সাক্ষী হতে যাচ্ছি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!