সন্তানদের মুখে যেকোনো খেলনা দেওয়ার আগে কিংবা সস্তা প্লাস্টিকের খেলনা কিনে দেওয়ার আগে এখন থেকে ১০ বার ভাবুন। কারণ, ঢাকার বাজার থেকে কেনা বিপুল পরিমাণ খেলনা ও শিশুপণ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো অত্যন্ত মারাত্মক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারে।
এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে দেশের শিশুদের রক্ষা করতে এবার এক ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশে প্রথমবারের মতো শিশুদের খেলনার জন্য ‘বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মান’ (Bangladesh Standard – BDS) নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয় খেলনাসহ মোট ৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে এখন থেকে নির্ধারিত মান পূরণ না করে কোনো খেলনা দেশে উৎপাদন, বিদেশ থেকে আমদানি বা বাজারে বিক্রি করা যাবে না।
কেন খেলনার মান নির্ধারণ করা জরুরি ছিল?
এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশুদের খেলনা বিএসটিআই (BSTI)-এর বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণের তালিকায় ছিল না। ফলে বাজারে অবাধে অত্যন্ত নিম্নমানের, ক্ষতিকর রাসায়নিক যুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ খেলনা বিক্রি হয়ে আসছিল।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বেসরকারি দুই সংস্থা ‘ইএসডিও’ (ESDO) এবং ‘বিএএন টক্সিকস’-এর এক যৌথ গবেষণায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৫০টি শিশুপণ্যের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশেই বিষাক্ত ভারী ধাতু পাওয়া যায়। এমনকি শিশুদের ব্যবহারের একটি পানির মগে সিসার মাত্রা পাওয়া যায় ১,৩৮০ পিপিএম, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অনুমোদিত নিরাপদ সীমা হচ্ছে মাত্র ৯০ পিপিএম!
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ অভিভাবকই জানেন না যে খেলনায় এরকম বিষাক্ত ধাতু থাকতে পারে। এই গবেষণার পর বিএসটিআই তড়িঘড়ি করে খেলনার মান নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয় এবং দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় পর তা এখন আলোর মুখ দেখল।
নতুন নিয়মে কী কী সুবিধা পাবেন অভিভাবকেরা?
শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসটিআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, এই নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে দেশের খেলনা বাজারে এক আমূল পরিবর্তন আসবে:
- শারীরিক ঝুঁকি হ্রাস: খেলনায় এমন কোনো ধারালো প্রান্ত বা সহজে খুলে যাওয়া ছোট অংশ রাখা যাবে না, যা শিশুদের শ্বাসরোধ, আগুন বা শারীরিক আঘাতের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
- বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা: খেলনা তৈরিতে ক্ষতিকর বা বিষাক্ত রং, অতিরিক্ত সিসা বা ভারী ধাতু ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- নিরাপদ বাজার: বাজার থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত নিম্নমানের ও ক্ষতিকর খেলনা উধাও হয়ে যাবে এবং অভিভাবকেরা শতভাগ নিরাপদ খেলনা কেনার সুযোগ পাবেন।
৭ হাজার কোটি টাকার খেলনা বাজার ও রপ্তানির সম্ভাবনা
বর্তমানে বাংলাদেশে খেলনার বাজারটি অনেক বড়। যদিও এর বড় অংশই চীন থেকে আমদানিনির্ভর, তবুও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানও কম নয়।
- বাজারের আকার: দেশে খেলনার সামগ্রিক বাজারের আকার প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে ৪,০০০ কোটি টাকার খেলনা দেশেই তৈরি হয় এবং বাকি ৩,০০০ কোটি টাকার খেলনা আমদানি করা হয়।
- রপ্তানি বাণিজ্য: দেশে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ১২টি বড় প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর প্রায় ৪৭টি দেশে নিয়মিত খেলনা রপ্তানি করে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫ কোটি ৪৪ লাখ মার্কিন ডলারের খেলনা বিদেশে রপ্তানি করেছে।
আন্তর্জাতিক মান (International Standard) অনুসরণ করে খেলনা তৈরি বাধ্যতামূলক করায় এখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী খেলনার গ্রহণযোগ্যতা ও রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
খেলনাসহ যে ৭টি পণ্যে মান বাধ্যতামূলক করা হলো
শিল্প মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শুধু খেলনাই নয়, জনস্বার্থ ও ভোক্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নতুন বা সংশোধিত বাংলাদেশ মান (BDS) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পণ্যগুলো হলো:
১. শিশুদের খেলনা: উৎপাদন ও আমদানির আগে বিএসটিআই-এর নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
২. প্লাস্টিক ফিডিং বোতল: শিশুদের দুধ বা জল খাওয়ার বোতলের প্লাস্টিকের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. এলইডি লাইট (LED Light): আলো উৎপাদন ক্ষমতা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান মানতে হবে।
৪. ফর্টিফায়েড কর্ন ওয়েল (ভুট্টার তেল): ভোজ্য তেলের গুণগত মান এবং এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে।
৫. কংক্রিটের ব্লক: ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত ব্লকের স্থায়িত্ব ও মান পরীক্ষা করা হবে।
৬. কৃত্রিম তন্তুর শাড়ি: কাপড়ের গুণগত মান ও সুতার কারিগরি বৈশিষ্ট্য ঠিক থাকতে হবে।
৭. নারী ও মেয়েদের বোনা পোশাকের কাপড়: কাপড়ের রঙের স্থায়িত্ব এবং কেমিক্যালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ ক্রেতারা স্বাগত জানালেও কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ‘বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি মো. শওকত আলী জানান, এই নিয়ম কার্যকর করার আগে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় দেওয়া উচিত।
তাছাড়া, দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা হাজার হাজার খেলনা দ্রুত পরীক্ষা করার জন্য বিএসটিআই-এর পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি ও অবকাঠামো আছে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। মান পরীক্ষা করার কারণে খেলনার উৎপাদন ও আমদানি খরচ কিছুটা বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে খুচরা মূল্যের ওপর। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবকাঠামো ঠিক করে নিয়মটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে ছোট ব্যবসায়ীরা লোকসানের হাত থেকে বাঁচবেন।
নিরাপদ ভবিষ্যৎ সবার কাম্য
যেকোনো নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে শুরুতে কিছুটা জটিলতা বা খরচ বাড়লেও, শিশুদের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না। খেলনা ও ফিডিং বোতলের মতো অতি সংবেদনশীল পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করার এই সরকারি সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি মাইলফলক। এখন শুধু প্রয়োজন প্রশাসনের সঠিক ও কঠোর নজরদারি, যাতে কোনো ফাঁকফোকর গলে নিম্নমানের বা বিষাক্ত পণ্য আমাদের সন্তানদের হাতে পৌঁছাতে না পারে।








