মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৭০ থেকে ৮০ বছর, সেখানে একটি গাছ হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে এটা ভাবলেই অবাক লাগে। শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, সেই গাছে এখনও নিয়মিত ফল ধরছে! শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও এটি একদম বাস্তব।
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের ছোট্ট একটি গ্রাম ‘আনো ভ্যুভস’ (Ano Vouves)। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের প্রাচীনতম জলপাই গাছ। হাজার বছরের রোদ, বৃষ্টি, ঝড় আর ইতিহাসের পালাবদল দেখেও সগর্বে মাথা উঁচু করে আছে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়টি।
ভ্যুভস গ্রামের জীবন্ত কিংবদন্তি
বিজ্ঞানীদের মতে, এই জলপাই গাছটির বয়স অন্তত ৩০০০ বছর। তবে ক্রিট বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিশেষজ্ঞের গবেষণায় উঠে এসেছে আরও চমকপ্রদ তথ্য। তাদের মতে, গাছটির বয়স ৪০০০ বছরেরও বেশি হতে পারে। এর মানে হলো, যখন পৃথিবীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটছিল কিংবা যিশু খ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল, তখনও এই গাছটি তার যৌবনকাল পার করছিল।
গাছটির আকার দেখলেই এর প্রাচীনত্বের প্রমাণ মেলে। এর কাণ্ডটি বিশাল ও প্যাঁচানো।
- পরিধি: প্রায় ১২.৫ মিটার (৪১ ফুট)।
- ব্যাস: প্রায় ৪.৬ মিটার।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এত বছর বয়সেও গাছটি বন্ধ্যা হয়ে যায়নি। কলম করার (Grafting) মাধ্যমে এই গাছে এখনও প্রচুর পরিমাণে জলপাই জন্মায়, যা থেকে উন্নত মানের জলপাই তেল তৈরি হয়।
অলিম্পিক ও ঐতিহাসিক সম্মাননা
এই জলপাই গাছটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, এটি গ্রিসের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন গ্রিসে জলপাই ডালকে শান্তির প্রতীক এবং বিজয়ের মুকুট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে, ২০০৪ সালে যখন এথেন্সে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়, তখন এই গাছটি এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
২০০৪ অলিম্পিকের ম্যারাথন বিজয়ীর মাথায় যে জলপাই পাতার মুকুট পরানো হয়েছিল, তা তৈরি করা হয়েছিল এই ভ্যুভস গাছের ডাল থেকেই। এর মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল হাজার বছরের পুরনো রাজসিক প্রথা। ১৯৯৭ সালে এই গাছটিকে ‘প্রাকৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ’ (Natural Monument) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পর্যটকদের জন্য এর পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি ‘জলপাই জাদুঘর’, যেখানে এই গাছের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত আছে।
পৃথিবীর আরও কিছু প্রাচীন গাছের গল্প
ভ্যুভস গ্রামের জলপাই গাছটি নিঃসন্দেহে অনন্য, তবে এটিই পৃথিবীর একমাত্র প্রাচীন গাছ নয়। প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসে আরও কিছু গাছ আছে, যাদের বয়স শুনলে আপনি চমকে যাবেন।
১. গ্রেট বেসিন ব্রিস্টলকোন পাইন (ক্যালিফোর্নিয়া): আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত এই গাছটির নাম ‘মেথুসেলাহ’। পাইনাস লঞ্জেভা প্রজাতির এই গাছটির বয়স প্রায় ৪৮৫৪ বছর! একটু ভেবে দেখুন, যখন মেসোপটেমীয় সভ্যতা তাদের নগর বানাচ্ছিল কিংবা মিশরে ফারাওদের রাজত্ব শুরু হচ্ছিল, তখন এই গাছটির বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল।
২. দ্য সিস্টারস (লেবানন): লেবাননে অবস্থিত ‘দ্য সিস্টারস’ বা ‘সিস্টারস অলিভ ট্রিস অব নোয়াহ’ নামের জলপাই গাছগুলোও ইতিহাসের বিস্ময়। ধারণা করা হয়, এদের বয়স প্রায় ৬০০০ বছর। বাইবেলে বর্ণিত নূহ নবীর মহাপ্লাবনের সময়ের সাক্ষী হিসেবে স্থানীয়রা এই গাছগুলোকে শ্রদ্ধা করে।
প্রকৃতির টিকে থাকার লড়াই
হাজার হাজার বছরে পৃথিবীতে অগণিত যুদ্ধ হয়েছে, মহামারি এসেছে, খরা ও দাবানলে পুড়েছে বনভূমি। কিন্তু এই গাছগুলো যেন প্রকৃতির অদম্য শক্তির প্রতীক। এরা প্রমাণ করে যে, যত্ন নিলে এবং পরিবেশ রক্ষা করলে প্রকৃতি তার সম্পদ আমাদের উজাড় করে দিতে পারে।
ভ্যুভস গ্রামের সেই জলপাই গাছটি আমাদের শেখায় শেকড় শক্ত হলে ঝড়ের দাপটও তুচ্ছ হয়ে যায়। গ্রিসের ওই ছোট্ট গ্রামে গেলে আপনিও হয়তো ছুঁয়ে দেখতে চাইবেন ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষীটিকে।








