নতুন বছরের শুরুতেই দেশবাসীর জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এলো সরকার। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে। জানুয়ারি মাসের জন্য ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২ টাকা করে কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল থেকেই ডিপো ও পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের এই নতুন দর কার্যকর হবে। দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি তেলের এই মূল্যহ্রাস কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন দরে কোন তেলের দাম কত?
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরণের তেলের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা কমানো হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দরগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ডিজেল: প্রতি লিটার ১০২ টাকা (আগে ছিল ১০৪ টাকা)।
- কেরোসিন: প্রতি লিটার ১১৪ টাকা (আগে ছিল ১১৬ টাকা)।
- পেট্রোল: প্রতি লিটার ১১৮ টাকা (আগে ছিল ১২০ টাকা)।
- অকটেন: প্রতি লিটার ১২২ টাকা (আগে ছিল ১২৪ টাকা)।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন খাত, কৃষি সেচ এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারীদের খরচ কিছুটা কমবে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে, তাই এই মূল্যহ্রাস অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত।
কেন কমল জ্বালানি তেলের দাম?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, হঠাৎ কেন তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এর প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশীয় বাজারের মূল্যের সমন্বয়। সরকার গত বছরের মার্চ মাস থেকে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করেছে। এই পদ্ধতির আওতায় প্রতি মাসেই বিশ্ববাজারের দামের ওপর ভিত্তি করে দেশে তেলের দাম সমন্বয় করা হয়।
আইএমএফ-এর শর্ত ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অন্যতম শর্ত ছিল জ্বালানি তেলের ওপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করা। সেই শর্ত মেনেই গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি সরকার জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ঘোষণা করে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রতি মাসেই জ্বালানির মূল্য হালনাগাদ করা হয়। বাংলাদেশেও এখন সেই চর্চা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমে, তখন দেশের বাজারেও দাম কমানো হয়। আবার বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তা সমন্বয় করা বা বাড়ানো হয়।
জনজীবনে ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব
জ্বালানি তেলের দাম কমার সংবাদটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় সুখবর। বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
১. পরিবহন খরচ: বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের বড় অংশই ডিজেল চালিত ট্রাক ও লরির ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম কমলে পণ্য পরিবহর খরচ কমার কথা, যা পরোক্ষভাবে বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে।
২. কৃষি খাত: বর্তমানে বোরো মৌসুম চলছে। কৃষি সেচের জন্য প্রচুর পরিমাণে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। দাম কমায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ কিছুটা সাশ্রয় হবে।
৩. যাত্রী পরিবহন: বাস ও লঞ্চের ভাড়ার বিষয়টিও জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে জড়িত। যদিও লিটারে মাত্র ২ টাকা কমানো হয়েছে, তবুও এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিজেলের গুরুত্ব ও ব্যবহারের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। এই বিশাল চাহিদার সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশই দখল করে আছে ডিজেল। বাকি ২৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে।
ডিজেল মূলত তিনটি প্রধান খাতে ব্যবহৃত হয়:
- কৃষি সেচ কাজে।
- পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে।
- বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটরে।
যেহেতু ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, তাই এই তেলের দাম সামান্য কমলেও জাতীয় অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে, অকটেন ও পেট্রোল সাধারণত ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত হয়।
বিপিসির লাভ-ক্ষতির হিসাব
জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে বিপিসির লাভ-ক্ষতির একটি নিজস্ব সমীকরণ রয়েছে। বিপিসি সাধারণত অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে সবসময়ই মুনাফা করে থাকে। সংস্থাটির লাভ বা লোকসান মূলত নির্ভর করে ডিজেল বিক্রির ওপর। কারণ ডিজেলের গ্রাহক ও বিক্রির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
আগে জ্বালানি তেলের মধ্যে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম বিপিসি নিয়মিত সমন্বয় করত। এখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে। আর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
নতুন বছরের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি জনবান্ধব পদক্ষেপ। যদিও লিটারে মাত্র ২ টাকা কমানো হয়েছে, তবুও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির কারণে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের মানুষ আরও বেশি সুফল পাবে বলে আশা করা যায়। সরকারের এই ধারাবাহিক সমন্বয়ের ফলে জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এখন দেখার বিষয়, তেলের দাম কমার এই সুফল সাধারণ জনগণ পরিবহন ভাড়া বা পণ্যের দাম কমার মাধ্যমে কতটুকু ভোগ করতে পারেন।








