হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
রবিবার, জুন ২১, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানা ২ হাজার টাকা: কঠোর অবস্থানে সরকার
spot_img

প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানা ২ হাজার টাকা: কঠোর অবস্থানে সরকার

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এখন থেকে চাইলেই আর যেখানে-সেখানে বা জনসমাগমস্থলে ধূমপান করা যাবে না। যদি কেউ এই নিয়ম অমান্য করে পাবলিক প্লেসে ধূমপান করেন, তবে তাকে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হবে। প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানার পরিমাণ ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা এই ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে ২০০৫ সালের পুরোনো আইনকে আরও যুগোপযোগী ও কঠোর করা হয়েছে।

জরিমানার পরিমাণ বাড়ল প্রায় ৭ গুণ

এতদিন পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে নামমাত্র ৩০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল, যা অনেকেই তোয়াক্কা করতেন না। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশে এই শাস্তির মাত্রা ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কোথায় কোথায় ধূমপান নিষিদ্ধ?

শুধু জরিমানা বৃদ্ধিই নয়, নতুন অধ্যাদেশে ‘পাবলিক প্লেস’ বা জনসমাগমস্থলের সংজ্ঞাও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ধূমপায়ীদের জন্য স্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিচের স্থানগুলো পাবলিক প্লেস হিসেবে গণ্য হবে এবং সেখানে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ:

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তার আঙিনা।
  • সরকারি-বেসরকারি অফিস ও আদালত।
  • হাসপাতাল ও ক্লিনিক।
  • রেস্টুরেন্ট ও হোটেল।
  • শপিংমল ও বিপণী বিতান।
  • বাস, ট্রেন বা লঞ্চ টার্মিনাল।
  • পার্ক ও মেলা প্রাঙ্গণ।
  • এমনকি ভবনের বারান্দা, প্রবেশপথ এবং আশপাশের উন্মুক্ত স্থান।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগের আইনে পাবলিক প্লেসে বা অফিসে ধূমপানের জন্য আলাদা স্থান (Smoking Zone) নির্ধারণের সুযোগ ছিল। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশে সেই সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন থেকে পাবলিক প্লেসের সীমানার ভেতরে কোথাও আর ধূমপান করা যাবে না।

প্যাকেটে ৭৫ শতাংশ জুড়ে সতর্কবার্তা

তামাকজাত পণ্যের মোড়ক বা প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে সিগারেটের প্যাকেটের ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা (যেমন: ধূমপানে ক্যান্সার হয়) লেখা থাকত। নতুন অধ্যাদেশে এটি বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এখন থেকে প্যাকেটের উভয় পাশে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ জায়গাজুড়ে রঙিন ছবি এবং বড় অক্ষরে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনের তারিখ এবং ধূমপান ত্যাগে সহায়তার জন্য ‘কুইটলাইন হেল্প নম্বর’ উল্লেখ করতে হবে। ‘স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং’ ছাড়া কোনো তামাক পণ্য বাজারে বিক্রি করা যাবে না।

নাটক-সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য নিষিদ্ধ

তরুণ সমাজকে তামাকের গ্রাস থেকে বাঁচাতে মিডিয়ার ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম, সিনেমা, নাটক এবং প্রামাণ্যচিত্রে তামাক বা ই-সিগারেট ব্যবহারের কোনো দৃশ্য প্রচার করা যাবে না।

একইসাথে ইন্টারনেট বা অন্য কোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো নাটক বা সিনেমায় তামাক ব্যবহারের দৃশ্য থাকে, তবে তা অপসারণ করতে হবে।

দোকান সাজিয়ে সিগারেট রাখা যাবে না

আমরা সচরাচর দেখি, মুদি দোকান বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে সিগারেটের প্যাকেট খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয় (Display)। নতুন আইনে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

  • পয়েন্ট অব সেলস: বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট বা মোড়ক প্রদর্শন করা যাবে না।
  • দৃষ্টির আড়ালে: ক্রেতা যখন চাইবে, কেবল তখনই বিক্রেতা পণ্য বের করে দেবেন। বাকি সময় সব তামাক পণ্য দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে।
  • সিএসআর নিষিদ্ধ: তামাক কোম্পানিগুলো এতদিন ‘করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা’ (CSR)-এর নামে বিভিন্ন অনুদান দিয়ে নিজেদের লোগো প্রচার করত। অধ্যাদেশে তামাক কোম্পানির নাম, লোগো বা সহায়তা প্রদর্শনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কোম্পানি ও বিক্রেতাদের জন্য কঠোর শাস্তি

শুধু ধূমপায়ীদের নয়, যারা তামাক ব্যবসা বা প্রচারের সাথে জড়িত, তাদের জন্যও শাস্তির বিধান কঠোর করা হয়েছে। তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ বিজ্ঞাপন, সিএসআর কার্যক্রম বা বিক্রয়স্থলে পণ্য প্রদর্শনের নিয়ম অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আগে এটি ছিল ১ লাখ টাকা।

আইন ভঙ্গের অভিযোগ ও মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। প্রয়োজনে অবৈধ বিজ্ঞাপন সরাতে কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে পারবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাবের আশা

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ধূমপান হূদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার এবং ফুসফুসের জটিলতার অন্যতম প্রধান কারণ। পরোক্ষ ধূমপান (Passive Smoking) অধূমপায়ীদের জন্যও সমান ক্ষতিকর। সরকারের এই কঠোর অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত হলে পাবলিক প্লেসে অধূমপায়ীরা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিমানার ভয় এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে এই অধ্যাদেশ মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে এই আইনের সঠিক ও কঠোর বাস্তবায়ন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!