ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহান থেকে শুরু করে রাজধানী তেহরান পুরো দেশ এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের এমন সব লোমহর্ষক তথ্য সামনে আসছে, যা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বাধা তৈরি করা হচ্ছে, তা এক চরম মানবিক সংকট তৈরি করেছে।
হাসপাতালের গেটে যখন গ্রেফতারের আতঙ্ক
ইরানে বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে হাসপাতালে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ‘তারা’ (ছদ্মনাম) নামের এক বিক্ষোভকারীর অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, মোটরসাইকেলে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোনো প্ররোচনা ছাড়াই সরাসরি গুলি চালায়। গুলিতে আহত হয়েও তারা হাসপাতালে যাওয়ার সাহস পাননি।
তাদের আশঙ্কা ছিল, হাসপাতালে পা রাখা মাত্রই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের গ্রেফতার করবে। এই ভয় কেবল তারা নয়, বরং হাজার হাজার আহত আন্দোলনকারীর। তারা মনে করছেন, হাসপাতালের মেডিকেল রেকর্ড ব্যবহার করে পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করছে।
বাড়িতেই সার্জন যখন দেবদূত: গোপন চিকিৎসার নেপথ্যে
হাসপাতালে যেতে না পেরে অনেক বিক্ষোভকারী এখন পরিচিত চিকিৎসক বা স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভর করছেন। বাড়ির অন্ধকার ঘরে, অপ্রতুল সরঞ্জামের মাঝেই চলছে জটিল অস্ত্রোপচার।
- আবদ্ধ ঘরে অপারেশন: অনেক সার্জন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের বাড়িতে গিয়ে গুলি বের করছেন বা ক্ষত পরিষ্কার করছেন।
- অসম্পূর্ণ চিকিৎসা: অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে শরীরের গভীরে ঢুকে যাওয়া গুলি বের করা সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন যে, এই বুলেটগুলো সারা জীবন তাদের শরীরে রয়ে যাবে।
- অমানবিক পরিশ্রম: তেহরানের একজন সার্জন ‘নিমা’ জানিয়েছেন, তিনি টানা ৯৬ ঘণ্টা কোনো ঘুম ছাড়াই অস্ত্রোপচার করেছেন। তার গাউন থেকে শুরু করে অন্তর্বাস পর্যন্ত আহত তরুণদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
ইরানের এই দমন-পীড়নে ঠিক কতজন হতাহত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা বের করা কঠিন। কারণ দেশটিতে বর্তমানে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নেই। তবে হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA) কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে:
| ক্যাটাগরি | সংখ্যা (নিশ্চিত) |
| মোট মৃত্যু | ৬,৩০১ জন |
| শিশু | ১১২ জন |
| বিক্ষোভকারী | ৫,৯২৫ জন |
| আহত (ধারণা করা হচ্ছে) | ১১,০০০+ জন |
| গ্রেফতার | ১৭,০০০ এর বেশি |
চিকিৎসকদের ওপর বাড়ছে চাপ
আহতদের চিকিৎসা দেওয়া এখন ইরানে অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, যারা গোপনে বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসক ও নার্সদের টার্গেট করছে প্রশাসন। নরওয়েভিত্তিক সংগঠন আইএইচআর জানিয়েছে, ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচজন চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাজভিনের সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনির বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
চোখের আঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্ব
বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ছররা গুলিতে অনেক তরুণ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের তথ্যমতে, কয়েকশ মানুষের চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নার্সরা লুকিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে রোগীদের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাচ্ছেন যাতে পুলিশ টের না পায়। অনেক তরুণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে, যার ফলে তারা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছেন।
পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি ভাষ্য
অবশ্য ইরান সরকার এই পরিসংখ্যানগুলোকে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা ‘দাঙ্গাবাজদের’ হামলায় সাধারণ পথচারী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে যে, তারা হাসপাতালে নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দিচ্ছে এবং মানুষ সরকারের ওপর আস্থা রাখছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্ক সরকারি এই দাবির সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
ইরানের এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি এখন এক বিশাল মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। একদিকে গুলি আর অন্যদিকে সুচিকিৎসার অভাব এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র এখনো অত্যন্ত জটিল ও ভয়ংকর।
সূত্র: বিবিসি








